এখন সময় :
,
PopularITLtd.com
মেনু |||

ভারত–পাকিস্তানের মধ্যে অঘোষিত আকাশযুদ্ধ

আমাদের সকাল ডেস্ক : বালাকোট হামলার পরদিনই শুরু হয়ে গেল ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অঘোষিত আকাশযুদ্ধ। পাকিস্তানের দাবি, নিয়ন্ত্রণরেখা পার হওয়া দুটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান তারা গুলি করে ভূপাতিত করেছে। আটক করেছে এক পাইলটকে। আর ভারতের দাবি, তারাও ধ্বংস করেছে পাকিস্তানের একটি যুদ্ধবিমান। তবে হারিয়েছে নিজেদের একটি যুদ্ধবিমান। নিখোঁজ রয়েছেন এক ভারতীয় পাইলট।

 

সীমান্তজুড়ে এই খই ফোটা উত্তেজনার মধ্যে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীরা প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ভারতের প্রতি আলোচনার আহ্বান জানান।

 

১৪ ফেব্রুয়ারি ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ভারতের আধা সামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) গাড়িবহরে আত্মঘাতী হামলায় ৪০ জওয়ান নিহত হন। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মুহাম্মদ এ হামলার দায় স্বীকার করে। ওই ঘটনার ১২ দিন পর গত মঙ্গলবার ভোরে পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বালাকোটে হামলা চালায় ভারতীয় যুদ্ধবিমান। এ নিয়ে মঙ্গলবার দিনভর টান টান উত্তেজনার মধ্যেই দুই দেশের সেনাদের মধ্যে কাশ্মীর সীমান্তে গুলিবিনিময় হয়। রাতে গোলাবিনিময়ও হয়। রাত পোহাতেই বালাকোটে হামলার বদলা নেয় পাকিস্তান।

 

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ গফুরের দাবি, বুধবার সকালে চারটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে কাশ্মীরে ঢুকে পড়ে বোমা ছোড়ে। তাদের ধাওয়া করা ভারতীয় যুদ্ধবিমান মিগ-২১ নিয়ন্ত্রণরেখা পার হলে পাকিস্তান দুটি বিমান গুলি করে নামায়। দুই পাইলট তাঁদের হাতে বন্দী। একজন আহত হয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সন্ধ্যার দিকে অবশ্য আসিফ গফুর জানান, তাঁদের হাতে ভারতের একজন পাইলটই আটক হয়েছেন।

 

পাকিস্তানের এই দাবি পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়নি ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সন্ত্রাস দমন অভিযানের পাল্টা হিসেবে পাকিস্তান বুধবার সকালে ভারতীয় এলাকায় হানা দেয়। তাদের যুদ্ধবিমানের লক্ষ্য ছিল ভারতীয় সামরিক ঘাঁটি। কিন্তু ভারতের বিমানবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে তারা ব্যর্থ হয়।’ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ওই প্রতিরোধের সময় একটি পাকিস্তানি এফ–১৬ যুদ্ধবিমানকে গুলি করে ভারতীয় মিগ-২১ বাইসন। বিমানটি নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে বিধ্বস্ত হয়। এই প্রতিরোধে ভারতও একটা মিগ-২১ হারিয়েছে। পাইলট নিখোঁজ।’

 

পাইলট উইং কমান্ডার ভি অভিনন্দনকে নির্যাতন করা হয়েছে অভিযোগ তুলে ভারত বলেছে, এর মাধ্যমে পাকিস্তান ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। পাইলটকে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

 

তবে ওই পাইলটের একটি ভিডিও প্রকাশ করে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, তাঁকে নির্যাতন করা হয়নি। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, চায়ের মগ হাতে কথা বলছেন ওই পাইলট।

 

বালাকোটে মঙ্গলবারের অভিযানের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক জনসভায় বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, দেশকে রসাতলে যেতে দেব না, থমকে যেতে দেব না, মচকাব না। ভারতমাতাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তাঁর সম্মান রক্ষা করব। আপনাদের আশ্বস্ত করে বলতে পারি, দেশের নেতৃত্ব উপযুক্ত হাতেই আছে।’ এরপর গতকাল তিনি এই উত্তেজনা নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করেননি।

 

তবে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার খবর পেয়েই মোদি গতকাল এক অনুষ্ঠান ছেড়ে নয়াদিল্লিতে নিজের সরকারি বাসভবনে তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রায় একই সময়ে ইসলামাবাদে জরুরি বৈঠক করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। পরমাণুবিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার রয়েছে যাঁদের, তাঁরা সবাই ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এরপর টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে ইমরান বলেন, ‘আমাদের দেশে ঢুকলে আমরাও যে তা করতে পারি, সেটা বোঝানোই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা কী করতে পারি, কতটা ক্ষমতা, এটা নমুনা। দুটো মিগ বিমান গুলি করে নামানো হয়েছে। এখন আমাদের বুদ্ধি, বিবেচনা ও প্রজ্ঞা দ্বারা পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।’

 

ভারতকে সতর্ক করে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উত্তেজনা বেড়ে গেলে আমার বা নরেন্দ্র মোদি—কারও হাতে আর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।’ ভারতের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আলোচনার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া জরুরি।’

 

ইমরানের ওই মন্তব্যের কোনো প্রতিক্রিয়া সন্ধ্যা পর্যন্ত ভারত দেয়নি। তবে পাকিস্তানের উপহাইকমিশনারকে গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়।

 

সকালের ওই ঘটনার পর প্রথম বিবৃতি আসে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে। এতে বলা হয়, ‘সংঘাত বাড়ানোর কোনো আগ্রহ পাকিস্তানের নেই। ভারতের সঙ্গে শান্তি স্থাপনই পাকিস্তানের কাম্য। ভারতের হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে এই অভিযান স্রেফ নিজেদের শক্তি দেখাতে। এটাই আমরা বোঝাতে চেয়েছি যে প্রয়োজনে আমরা পুরোপুরি তৈরি। এই কারণে দিনের আলোয় এই অভিযান চালানো হয়েছে।’

 

বালাকোটে ভারত যা করেছে, আন্তর্জাতিক স্তরে তার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। চীনের উঝেনে গতকাল ভারত, রাশিয়া ও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ত্রিপক্ষীয় সম্মেলনে সুষমা বলেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের স্বর্গ হয়ে উঠেছে। আত্মরক্ষার জন্যই ভারত বাধ্য হয়ে সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে আক্রমণ করেছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতির অবনতি হোক ভারত চায় না। ভারত বরাবরের মতোই দায়িত্বশীল ও সংযত।

 

এদিকে গতকাল সকালে কাশ্মীরের বদগাম এলাকায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। এতে থাকা বিমানবাহিনীর ছয় কর্মকর্তাই নিহত হন। একজন বেসামরিক লোকও নিহত হয়েছেন। হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ জানা যায়নি। তবে ওই সময় ওই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণরেখায় দুই দেশের মধ্যে গোলাগুলি চলছিল বলে খবর পাওয়া গেছে।

 

ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় এবং দুই দেশের সেনাদের মধ্যে গোলাগুলি হওয়ায় গতকাল পাকিস্তানমুখী ফ্লাইট বাতিল করেছে বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকটি এয়ারলাইনস। এসব এয়ারলাইনসের মধ্যে এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, ইতিহাদ, ফ্লাই দুবাই, গালফ এয়ার ও শ্রীলঙ্কা এয়ারলাইনস অন্যতম। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজসহ কয়েকটি এয়ারলাইনস পাকিস্তান অভিমুখী যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের গতিপথ ঘুরিয়ে নেয়।

 

ভারতেও বেসামরিক বিমান চলাচলে প্রভাব ফেলেছে এই উত্তেজনা। জম্মু-কাশ্মীর, পাঞ্জাব ও হিমাচল প্রদেশের ৯টি বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ ওঠানামা স্থগিত করেছিল কর্তৃপক্ষ। পরে অবশ্য এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। সতর্কমূলক ব্যবস্থা হিসেবে গতকাল সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয় দিল্লি মেট্রোর পুরো নেটওয়ার্কে।

 

 

আমাদের সকাল/এসআর

Share Button
সম্পাদক: রিনি জাহান
নির্বাহী সম্পাদক : মো. কাইছার নবী কল্লোল
যোগাযোগ : ১/এ, (২য় তলা), পুরানা পল্টন লেন, ঢাকা-১০০০
ফোন নম্বর : ০১৬২১০৩৫২৮৯, ০১৬৩৪৭৩১৩৪২
Email: amadarshokal24@gmail.com