এখন সময় :
,
PopularITLtd.com
মেনু |||

এক সৈনিকের বাড়ি ফেরা : আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

আমাদের সকাল ডেস্ক :
                                           এক সৈনিকের বাড়ি ফেরা : আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
                                                      অনুবাদ : মোজাফ্ফর হোসেন

 

বিশ্বযুদ্ধ ও হেমিংওয়ে :

 

আমেরিকান সাহিত্যে হেমিংওয়ের মতো করে যুদ্ধকে আর কেউ উঠিয়ে আনতে পারেননি। গোটাবিশে^ ওয়ার রাইটিংস বা যুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যকর্মের প্রসঙ্গ উঠলেই চলে আসে এই নোবেলজয়ী মার্কিন কথাসাহিত্যিকের কথা। তাঁর সাহিত্যে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও যুদ্ধপরবর্তী নিসঙ্গতা বা হতাশার কথা যেভাবে এসেছে তিনি নিজে যুদ্ধসৈনিক না হলে হয়ত সেভাবে আসতে না। ব্যক্তিজীবনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাংবাদিক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধচলাকালে হেমিংওয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র। ১৯১৭ সালের এপ্রিল মাসে আমেরিকা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। জার্মান এবং অস্ট্রিয়ার বিপক্ষ জোটে শরিক হয়। ১৮ বছর পূর্ণ হলে হেমিংওয়ে আর্মিতে নিজের নাম লেখানোর চেষ্টা চালান; কিন্তু বাম চোখে সমস্যা থাকার কারণে বাদ পড়ে যান। যখন তিনি জানতে পারেন যে, রেডক্রস স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার নিচ্ছে, তিনি দ্রুত নিজের নাম লেখান। তিনি কানসাস শহরে কাজ করেন। এই শহরের কথা বর্তমান গল্পে উল্লেখ আছে। যুদ্ধচলাকালে ‘স্টার’ নামক সংবাদপত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতায় পরবর্তীতে ফিকশন লেখার ক্ষেত্রে হেমিংওয়ের জন্যে বড় সম্পদ হয়ে দাঁড়ায়। ছোট ছোট বাক্য, সংক্ষিপ্ত কার্যকরী বয়ান, অতিকথন বর্জন- এগুলো তিনি সংবাদমাধ্যমে কাজ করতে করতে আয়ত্তে আনেন।

 

যুদ্ধকালে হেমিংওয়ে প্রথমে যান প্যারিসে, এরপর মিলানে। যেদিন তিনি মিলানে পৌঁছান, সেদিনই সামরিক ভান্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। হেমিংওয়ে সৈনিকদের ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া শরীর মর্গে বয়ে আনেন। তিনি ঐ প্রথম প্রত্যক্ষ করেন যুদ্ধের বীভৎস চিত্র। এরপর তিনি নিজেও অস্ট্রিয়ার মর্টার সেলে আহত হন। ঐ সময় তিনি ইটালিয়ান সৈন্যদের মধ্যে চকলেট ও সিগারেট বিলি করছিলেন। আহত অবস্থায় তিনি মিলানের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে নার্স Agnes von Kurowsky-এর সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। পরিচয় থেকে প্রণয়। যার অনুপ্রেরণায় তিনি লেখেন পৃথিবীবিখ্যাত উপন্যাস ‘এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’। একইভাবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’, আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘আইল্যান্ডজ ইন দ্য স্ট্রিম’ও তাঁর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে রচিত। এর বাইরেও তাঁর প্রায় প্রতিটা রচনায় কোনো না কোনোভাবে যুদ্ধোত্তর সমাজ ব্যবস্থার ছোঁয়া আছে।

 

‘সোলজার’স হোম’ গল্পটি-যার বাংলা আমি করেছি ‘সৈনিকের বাড়ি ফেরা’- হেমিংওয়ের ইন আওয়ার টাইম গল্পসংকলনে স্থান পায়। প্রকাশকাল ১৯২৫। ১৯১৯ সালের জানুয়ারিতে হেমিংওয়ে ইতালি থেকে আমেরিকা ফিরে আসেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর বাবা-মা মোটেও খুশি ছিলেন না। তিনি বাড়ি ফেরা মাত্রই তারা তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তারা কাজ খোঁজার জন্য অথবা পড়ালেখা শুরু করার জন্যে হেমিংওয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। কিন্তু হেমিংওয়ে ওসবের ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ এই গল্পের ক্রেবজ চরিত্রটি আসলে হেমিংওয়ে নিজেই। যুদ্ধফেরত একজন সৈনিকের হতাশাগ্রস্ত জীবন, এই গল্পের মূল বিষয়বস্তু।

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে একটা ‘লস্ট জেনারেশন’-এর সৃষ্টি হয়। হেমিংওয়ে নিজেই সেই জেনারেশনের প্রতিনিধি ছিলেন। বস্তুত তিনিই তাঁর উপন্যাস ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’-এ ‘লস্ট জেনারেশন’ শব্দবন্ধনীটি জনপ্রিয় করে তোলেন। হেমিংওয়ের সাহিত্যের প্রায় বেশিরভাগ চরিত্রই এই জেনারেশনের প্রতিনিধিত্ব করে। তারা পানশালায় সারারাত্রি ধরে মাছের মতো পান করে (অ্যা ওয়েল লাইটেড প্লেইস)। মত্ত হয়ে ষাড়ের লড়াই উপভোগ করে (দ্য সান অলসো রাইজেস)। মাছ ধরার নামে জীবনের একটা অংশ কাটিয়ে দেয় সমুদ্রে বসে থেকে (আইল্যান্ডজ ইন দ্য স্টিীম)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শরিক হন হেমিংওয়ে। এই দুই বিশ্বযুদ্ধ খুব কাছ থেকে দেখার বেদনা তিনি কিছুতেই ভুলতে পারেননি। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে জীবনটা তাঁর কাছে অর্থহীন বলে মনে হয়েছে। এই মনে হওয়ার চূড়ান্ত ফলই তাঁর আত্মহত্যা (১৯৬১)।]

 

 

ক্রেবজ কেনসাসের মেথডিস্ট কলেজ থেকে যুদ্ধে গিয়েছিল। একটা ছবি আছে যেখানে তাকে তার সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সকলে একইরকম কলারের জামা পরে। সে ১৯১৭ সালে মেরিনে নাম লেখায় এবং যুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় দফায় সৈন্যরা ফিরে আসার পর ১৯১৯ সালের গ্রীষ্মে সে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরে।

 

একটি ছবি আছে যেখানে তাকে দেখা যায়, রাইন নদীর তীরে সে দুজন জার্মান তরুণী ও একজন যুদ্ধসৈনিকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রেবজ এবং ঐ সৈন্যকে তাদের ইউনিফর্মের কারণে বেঢপ লাগছিল। জার্মান তরুণীদ্বয় সুন্দরী ছিল না। রাইন নদীকে সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছিল না।

 

যে-সময় ক্রেবজ ওকলাহোমায় তার নিজের শহরে ফিরে এল, যুদ্ধফেরত সৈনিকদের অভ্যর্থনাপর্ব শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে বেশ দেরি করে ফিরেছে। এই শহর থেকে যারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তাদের প্রত্যাবর্তনে বেশ উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে। একটা বড়সড় কোলাহলপূর্ণ আয়োজন ছিল সেটি। এখন সে-সব থিতিয়ে এসেছে। লোকজন বরং ক্রেবজের এত দেরিতে ফেরাকে ঠাট্টাসুলভ দৃষ্টিতে দেখছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার এতটা বছর পর ফিরেছে সে!

 

শুরুর দিকে ক্রেবজ যুদ্ধসংক্রান্ত কোনো কথা বলতে চাইত না। পরে সে যখন বলার প্রয়োজন মনে করছিল তখন শোনার মতো কেউ ছিল না। শহরটি এরই ভেতর যুদ্ধের যথেষ্ট ভীতিসঞ্চারক, উত্তেজনাকর ও দুঃসাহসিক গালগল্প শুনে শুনে ক্লান্ত। ক্রেবজ লক্ষ্য করলো, লোকজনকে তার কথা শোনাতে হলে তাকে মিথ্যে-বানোয়াট গল্প বলতে হবে। ক্রেবজ নিজে দুবার বানানো গল্প বলার চেষ্টা করে দেখলো, তার ভেতরে যুদ্ধ ও তার এই মিথ্যা বলা নিয়ে একধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হলো। এই মিথ্যে বলার কারণে যুদ্ধে তার সঙ্গে যা যা ঘটেছিল তার সে-সবের প্রতি বিস্বাদ দেখা দিল।

 

তার বলা মিথ্যাগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। অন্য সৈন্যরা যা দেখেছে, করেছে বা শুনেছে তার সঙ্গে সে নিজেকে জড়িয়ে গল্পগুলো তৈরি করেছিল। এমন কি তার বানিয়ে বলা গল্পগুলোও পুল রুমে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারেনি। অতিকথন বা বানিয়ে বলার কারণে ক্রেবজের ভেতর কেমন গা ঘিনঘিনে ভাবের সৃষ্টি হয়েছিল। যখন তার যুদ্ধফেরত অন্য কোনো সৈনিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটতো, এবং ড্রেসিংরুমে কয়েক মিনিটের জন্য কথা হতো, সে অন্যান্য সৈনিকদের ভেতরে পুরানো সৈনিকদের ভাবভঙ্গি আত্মস্ত করতো- যেটিতে সে ভীষণভাবে ভীত ছিল। এভাবে নিজের সবকিছু সে হারিয়ে ফেলেছিল।

 

এই সময়, এটা ছিল বিগত গ্রীষ্মকাল, সে খুব দেরি করে বিছানা থেকে ওঠে। এরপর সে হেঁটে শহরের লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করে। বাড়িতে দুপুরের খেয়ে, একঘেয়েমিতে ভোগার আগপর্যন্ত বাড়ির সম্মুখভাগের বারান্দায় বসে পড়তে থাকে। এরপর শহরের ভেতর দিয়ে দিনের সবচেয়ে গরম সময়টা পুল রুমের শীতল আবহে কাটাতে যায়। পুল খেলতে তার ভালো লাগে।

 

সন্ধ্যায় সে বাঁশি বাজানোর চেষ্টা করে। শহরের এদিক সেদিক পায়চারি করে, বই পড়ে এবং তারপর ঘুমুতে যায়। তখনও সে তার ছোট দুবোনের কাছে সে নায়ক ছিল। সে বললে তার মা বিছানাতে নাস্তা দিয়ে যায়। মা মাঝে-মধ্যে তার রুমে এসে যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে চায়, কিন্তু তার মনোযোগ পড়ে থাকে অন্যখানে। এসবের কোনো কিছুতেই তার বাবার কোনো আগ্রহ ছিল না।

 

যুদ্ধে যাওয়ার আগে পারিবারিক গাড়িটি চালানোর অনুমতি ক্রেবজ কখনই পায়নি। তার বাবার রিয়েল এস্টেট ব্যবসা ছিল। তিনি সবসময় তার ব্যবসার প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে অফিসের বাইরে গাড়িটি পার্ক করে রাখতেন। এখন, যুদ্ধের পরও সেই গাড়িটিই তাদের ছিল।

 

শহরের কোনো কিছুরই বদল ঘটেনি, শুধুমাত্র কিশোরী মেয়েরা বড় হয়ে উঠা ছাড়া। এদের সঙ্গে মেশার মতো সাহস বা হেতু ক্রেবজের কাছে ছিল না। যদিও সে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করত। সেখানে অনেক বেশি সুন্দরী তরুণী ছিল। অধিকাংশ মেয়েদের চুল ছোট করে ছাটা ছিল। যখন সে যুদ্ধে গিয়েছিল তখন শুধুমাত্র অল্পবয়সি মেয়েরা এইরকম কাট দিত। তারা সোয়েটার ও রাউন্ড কলার শার্ট পরত। এটারই তখন চল ছিল। সে বাড়ির সম্মুখভাগের বারান্দায় বসে মেয়েগুলোর রাস্তার এদিক থেকে ওদিক যাওয়া দেখে। সে তাদের গাছের ছায়ার নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়া উপভোগ করে। তাদের সোয়েটারে রাউন্ড ডাচ কলার তার পছন্দ হয়। তাদের সিল্কের মোজা এবং ফ্লাট স্যান্ডেল তার ভালো লাগে। সে তাদের ববকাট চুল ও হেঁটে যাওয়ার ধরন পছন্দ করে।

 

যখন সে শহরে আসে তখন আবার তাদের উপস্থিতি তার কাছে কোনো আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে না। গ্রিক আইসক্রিম পার্লারে সে তাদের পছন্দ করত না। সে তাদেরকে তাদের মতো করে পেতে চাইত না। তারা ভীষণ জটিল প্রকৃতির ছিল। সেখানে অন্যকিছু ছিল। প্রচ্ছন্নভাবে সে একটি মেয়ে প্রত্যাশা করত বটে কিন্তু সে তাকে পাওয়ার জন্য কোনো কিছু বাড়তি করতে চাইত না। সে হয়ত কোনো নারীসঙ্গ কামনা করত কিন্তু তাকে পাবার পেছনে পড়ে থাকতে চাইত না। সে প্রচলিত চক্রান্তÍ ও রাজনীতির ভেতর নিজেকে জড়াতে চাইত না। সে আসলে কোনোরকমের মিনতিকরা পছন্দ করত না। সে আর কোনো মিথ্যা বলেনি। তার কোনো দরকার পড়েনি। সে কোনো প্রত্যুত্তর বা ফলাফল প্রত্যাশা করত না। সে জীবনে আর কোনো ফল চায় না। সে ফলশূন্য জীবনযাপন করতে চায়। তাছাড়া সত্যিকারার্থে তার কোনো মেয়ের দরকার ছিল না। আর্মি থেকে সে এই শিক্ষা পেয়েছে। তোমার একটি মেয়ের দরকার, এমন ভাবা দোষের কিছু না। প্রায় সকলেই তাই ভাবে। তবে এটা সত্যি ছিল না। তোমার কোনো মেয়ের দরকার নেই। ওটা ছিল মজা করার বিষয়। শুরুতে এক তরুণ গর্ব করে বলেছিল যে, মেয়েরা তার কাছে কিছুই না; যে, সে কখনই মেয়েদের নিয়ে চিন্তা করে না; যে-মেয়েরা কখনই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তারপর অন্য একজন বুক উঁচিয়ে বলল যে, সে মেয়ে ছাড়া চলতে পারে না, তার সবসময় মেয়েদের প্রয়োজন, মেয়ে ছাড়া বিছানায় যেতে পারে না।

 

ঐসবই ছিল মিথ্যা বুলি। এটা দুভাবেই মিথ্যা। তুমি যতক্ষণ না মেয়েদের সম্পর্কে ভাবো ততক্ষণ তোমার কোনো মেয়ের দরকার নেই। সে এটা আর্মিতে শিখেছিল। পরে তুমি আজ হোক কাল হোক একটা মেয়ে পেয়েই যাবে। যখন তোমার সেই বয়স হবে, তখন তুমি ঠিকই একটি মেয়ে পেয়ে যাবে। তোমাকে এ নিয়ে ভাবতে হবে না। আজ কিংবা কাল, আসবেই। সে এটা আর্মিতে শিখেছে।

 

এখন কোনো মেয়ে যদি তার কাছে আসে এবং কথা বলতে না চায় তাহলে তার ঐ মেয়েকে ভালো লেগে যেতে পারে। তবে এখানে সেটা বেশ জটিল। সে বুঝতে পারে, এসব কাটিয়ে ওঠা তার পক্ষে আর সম্ভব না। ফরাসি এবং জার্মানি তরুণীদের প্রসঙ্গে কথাটা সত্য খাটে। সেখানে এভাবে কথা বলার চল ছিল না। তুমি বেশি কথা বলতে পারতে না এবং তার দরকার পড়ত না। এটা খুব সহজ বিষয় ছিল এবং সকলে তোমরা বন্ধু বনে যেত। সে ফ্রান্সের বিষয়ে চিন্তা করল এবং এরপর সে জার্মানি নিয়ে ভাবা শুরু করল। মোটের ওপর সে জার্মানিদের বেশি পছন্দ করত। সে জার্মানি ছেড়ে আসতে চায়নি। সে বাড়ি ফিরে আসতে চায়নি। তারপরও সে এসেছে। সে বারান্দায় বসে। যে সকল মেয়ে রাস্তায় অন্যদিক দিয়ে হেঁটে যায়, সে তাদের পছন্দ করে। সে তাদের হাবভাব জার্মান কিংবা ফরাসি মেয়েদের চেয়ে বেশি পছন্দ করে। কিন্তু যে জগতে তারা আছে সেই জগতে সে নেই। সে তাদের ভেতর থেকে একজনকে পেতে চায়। কিন্তু এটার মূল্য ছিল না। তারা খুব সুন্দর ডিজাইনের পোশাক পরে থাকে। সে ঐ ধরনটা পছন্দ করে। এটা বেশ উৎফুল্লকর ছিল। কিন্তু সে আলাপচারিতার মধ্যে জড়াতে চায় না। সে একজনকে অতটা ভীষণভাবে কামনা করে না। যদিও সে তাদের দেখতে পছন্দ করে। কিন্তু তার কোনো মূল্য ছিল না। এখনো যখন সবকিছু আবার ঠিক হতে শুরু করেছে।

 

সে বারান্দায় বসে বসে যুদ্ধের বই পড়ে। বইটা ছিল ইতিহাসের। সে যেখানে যেখানে যুদ্ধ করেছে সেখানকার অংশগুলো পড়ত। তার জীবনে সবচেয়ে উপভোগ্য পাঠ ছিল সেটি। সে মনে মনে প্রার্থনা করতো, বইটি যদি আরো মানচিত্রসংবলিত হত! এখন সে সত্যিকার অর্থে যুদ্ধটা কি জানছে। সে একজন ভালো সৈনিক ছিল। সেটাই পার্থক্য গড়ে দেয়।

 

সে বাড়ি ফেরার এক মাস পার হয়ে গেলে, একদিন সকালে তার মা তার শোবার ঘরে এসে তার বিছানায় বসেন। তিনি তার চাদরটা ঠিক করে নেন।

 

হ্যারল্ড গতরাতে তোমার বাবার সঙ্গে কথা হলো। মা বলেন। তিনি চান তুমি সন্ধ্যায় গাড়ি নিয়ে বাইরে যাও।

 

হুম। ক্রেবজ, মাথা নাড়ে। সে তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। গাড়ি নিয়ে বের হব? হ্যা?

 

হ্যাঁ, তোমার বাবা কয়দিন থেকেই ভাবছেন যে, তুমি সন্ধ্যায় গাড়ি নিয়ে বেরুতে পারো, যেখানে খুশি যাও। কিন্তু গতকালই প্রথম এ বিষয়ে আমাদের মাঝে কথা হলো।

 

আমি হলফ করে বলছি, তুমিই তাকে রাজি করিয়েছ। ক্রেবজ বলে।

 

না না। এটা তোমার বাবার পরামর্শ যে, আমি তোমার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলি।

 

হুম। আমি বেট ধরতে পারি, তুমি তাকে বুঝিয়েছ। ক্রেবজ বিছানায় উঠে বসে।

 

হ্যারল্ড, তুমি কি নাস্তা খেতে নিচে আসবে? তার মা জিজ্ঞেস করেন।

 

পোশাক পরেই আসছি। ক্রেবজ উত্তর করে।

 

তার মা রুম থেকে বের হয়ে আসে। সে শেভ এবং পোশাক পাল্টানোর সময় নিচে মায়ের কিছু একটা ভাজি করার শব্দ শুনতে পায়। সে যখন নাস্তা খেতে বসে তখন তার ছোটবোন একটা খাম হাতে আসে।

 

হ্যার, সে বলে, ঘুমখোড় বুড়ো কোথাকার! তুমি আবার কি ভেবে জেগে উঠলে?

 

ক্রেবজ তার দিকে তাকায়। সে তাকে পছন্দ করে। সে তার বোনদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো।

 

পেপার পেয়েছিস? সে জানতে চায়।

 

সে তার হাতে দ্য কানসাস সিটি স্টার ধরিয়ে দেয়। ক্রেবজ পেপার খুলে খেলাধুলার পাতাটা খোলে। সে পেপার ভাঁজ করে খেতে খেতে পড়ার চেষ্টা করে।

 

হ্যারল্ড , তার মা রান্নাঘরের দরজামুখে দাঁড়িয়ে, হ্যারল্ড দয়া করে পেপারটি ওভাবে ভাঁজ করো না। তোমার বাবা পড়তে পারবেন না।

 

সমস্যা নেই। আমি নষ্ট করছি না। ক্রেবজ বলে।

 

তার বোন টেবিলের সঙ্গে বসে বসে তার পেপার পড়া দেখে।

 

আমরা আজ বিকালে স্কুলের মাঠে খেলতে যাচ্ছি। সে বলল।

 

ভালো তো। ক্রেবজ বলে।

 

তুমি কি আসবে আমার খেলা দেখতে?

 

দেখি।

 

ওহ হ্যার, তুমি আমাকে ভালোবাসো না! ভালোবাসলে নিশ্চয় আমার খেলা দেখতে আসতে চাইতে।

 

ক্রেবজের মা ডাইনিং রুমে প্রবেশ করে।

 

তুই একাই যা আজ, হেলেন। তিনি বলেন। হ্যারল্ডের সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

 

তিনি হাতের প্লেটগুলো টেবিলে রেখে ক্রেবজের মুখোমুখি বসেন।

 

আমি চাই তুমি কয়েক মিনিটের জন্য পেপারটা টেবিলে রাখো হ্যারল্ড। তিনি বলেন।

 

ক্রেবজ পেপারটা নামিয়ে ভাঁজ করে রাখে।

 

তুমি কি করবে ভেবে দেখেছ? তার মা চোখের চশমা নামিয়ে জিজ্ঞেস করেন।

 

না। ক্রেবজ উত্তর করে।

 

তোমার কি মনে হয় না, এখনই ভাবার সময়? তার মা কথার কথা এসব বলছে না। তাকে বেশ গুরুগম্ভীর দেখায়।

 

আমি এ নিয়ে কিছু ভাবিনি। ক্রেবজ বলে।

 

ঈশ্বর তার দুনিয়ায় প্রতিটি মানুষের জন্য কোনো না কোনো কাজ রেখে দেন। তার মা বলেন। তার রাজ্যে কেউ বসে থাকবে, তা হবার নয়।

 

আমি তার রাজ্যে নেই। ক্রেবজ বলে।

 

আমরা সবাই তার রাজ্যে আছি।

 

ক্রেবজ মায়ের কথায় অপ্রস্তুত হয়ে ওঠে এবং বিরক্ত হয়।

 

হ্যারল্ড, আমি তোমাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তায় আছি। তার মা বলে চলেন। আমি জানি তুমি কি সব প্রলোভনে পড়েছ। জানি, পুরুষ মানুষ কতটা দুর্বল হয়। আমি জানি, তোমার প্রিয় দাদা, মানে আমার বাবা, সিভিল ওয়ার নিয়ে যা যা বলেছেন। এবং আমি তোমার জন্য প্রার্থনা করেছি। আমি তোমার জন্য সবসময় প্রার্থনা করি হ্যারল্ড।

 

ক্রেবজ তার প্লেটের ভাজা মাংস ছাড়াতে থাকে।

 

তোমার বাবাও চিন্তিত। মা বলে চলেন। তিনি ভাবছেন তুমি তোমার উচ্চাকাক্সক্ষা হারিয়ে ফেলেছ। তোমার জীবনে নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই। তোমার বয়সি চার্লি সিমনস ভালো চাকরিতে আছে, বিয়ে করতে চলেছে। তোমার বয়সি সকলেই কিছু না কিছু করে ঘর বসাতে চলেছে। তুমি দেখছ যে, চার্লির মতো ছেলেরাও সমাজের প্রশংসা কুঁড়িয়ে ফিরছে।

 

ক্রেবজ কোনো কথা বলে না।

 

ঐভাবে তাকিও না হ্যারল্ড। তার মা বলেন। তুমি জানো যে, আমরা তোমাকে ভালোবাসি এবং আমি তোমাকে বলতে চাই তোমার নিজের ভালোর জন্যে আমরা কতটা উদগ্রীব। তোমার বাবা তোমার স্বাধীন জীবনে বাধা সৃষ্টি করতে চান না। তিনি ভাবছেন তোমাকে গাড়িটা চালাতে দেয়া উচিত। যদি তুমি সুন্দরী মেয়েদের ভেতর থেকে কাউকে কাউকে সাথী করতে চাও, আমরা তাতেও খুশি। আমরা চাই, তুমি তোমার জীবন উপভোগ করো। তবে তোমাকে কাজে মন বসাতে হবে। তুমি কি দিয়ে শুরু করো, এ নিয়ে তোমার বাবা চিন্তিত নন। সব কাজ সম্মানের, তিনি যেমনটি বলেন। তবে তোমাকে কিছু না কিছু শুরু করতেই হবে। তিনি আজ সকালে তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমাকে বলেছেন। তুমি তার সঙ্গে অফিসে দেখা করো।

 

এই তো? বলা শেষ হয়েছে তোমার? ক্রেবজ বলে।

 

হ্যাঁ। তুমি কি তোমার মাকে ভালোবাসা না, বাবা?

 

না। ক্রেবজ সোজা উত্তর দেয়।

 

মা সরাসরি ছেলের দিকে তাকান। তার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। তিনি কাঁদতে শুরু করেন।

 

আমি কাউকেই ভালোবাসি না। ক্রেবজ বলে।

 

এটা তেমন ভালো কিছু না। সে মাকে ঠিক বলতে পারেনি, বোঝাতে পারেনি। এটা বলা বোকার মতো হয়ে গেছে। সে খালি খালি তাকে আঘাত দিয়েছে। সে এগিয়ে গিয়ে মায়ের হাত ধরে। তার মা তখন হাতের মধ্যে মাথা ডুবিয়ে কাঁদছিলেন।

 

আমি ঠিক বিষয়টি বলতে চাইনি। সে বলে। আমি কিছু একটার ওপর বিরক্ত হয়ে বলে ফেলেছি। আমি তোমাকে ভালোবাসি না, সেটা বলতে চাইনি।

 

তার মা কেঁদেই চলেন। ক্রেবজ মায়ের কাঁধে হাত রাখে।

 

মা, তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না?

 

তার মা মাথা নাড়ান।

 

প্লিজ, প্লিজ মা, প্লিজ আমাকে বিশ্বাস করো।

 

ঠিক আছে। সহসা মা বলে ওঠেন। তিনি তার দিকে তাকান। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি হ্যারল্ড।

 

ক্রেবজ মায়ের চুলে চুমু খায়। সে তার মুখে হাত রাখে।

 

আমি তোমার মা। তিনি বলেন। তুমি যখন ছোট ছিলে আমি তখন তোমাকে বুকে রেখে বড় করেছি।

 

ক্রেবজ কেমন অসুস্থ এবং অস্বস্তি অনুভব করে।

 

আমি জানি মা। সে বলে। আমি চেষ্টা করবো এবং তোমার জন্য ভালো ছেলে হবো।

 

হ্যারল্ড তুমি কি আমার সঙ্গে বসে প্রার্থনা করবে এখন? তার মা জিজ্ঞেস করে।

 

তারা ডাইনিং টেবিলের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে। ক্রেবজের মা প্রার্থনা শুরু করে।

 

এখন তুমি শুরু করো হ্যারল্ড। তিনি বলেন।

 

আমি পারব না। ক্রেবজ বলে।

 

চেষ্টা করো হ্যারল্ড।

 

পারব না।

 

তুমি কি চাও যে, আমি তোমার হয়ে প্রার্থনা করে দিই?

 

হ্যাঁ।

 

কাজেই তার মা তার জন্য প্রার্থনা করে। প্রার্থনা শেষ হলে তারা উঠে দাঁড়ায়। ক্রেবজ তার মাকে চুমু দিয়ে বাড়ির বাইরে বের হয়ে যায়। সে তার জীবনকে জটিল না করার জন্যে যথেষ্ট চেষ্টা করেছে। এতকিছুর পরও কোনোকিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। সে তার মায়ের জন্য দুঃখবোধ করে। মা তাকে দিয়ে মিথ্যে বলিয়েছে। সে কানসাস শহরে যাবে, একটা চাকরি খুঁজে নেবে এবং সে তাতে বেশ খুুশি হবে। সে চলে যাওয়ার আগে খুব সম্ভবত আরো একটি দৃশ্য বাকি আছে। সে তার বাবার অফিসে যাবে না। সে ওটা মিস করবে। সে চায় তার জীবন সরলভাবে কাটুক। এটা এভাবেই গেছে। যাই হোক, এখন আর ওসব ভেবে কাজ নেই। সে স্কুলমাঠে যাবে এবং হেলেনের ইনডোর বেসবল খেলা দেখবে।

 

 

আমাদের সকাল/সোহেল রানা

Share Button
সম্পাদক: রিনি জাহান
নির্বাহী সম্পাদক : মো. কাইছার নবী কল্লোল
যোগাযোগ : ১/এ, (২য় তলা), পুরানা পল্টন লেন, ঢাকা-১০০০
ফোন নম্বর : ০১৬২১০৩৫২৮৯, ০১৬৩৪৭৩১৩৪২
Email: amadarshokal24@gmail.com