এখন সময় :
,
PopularITLtd.com
মেনু |||

উপন্যাসের মঞ্চভ্রমণ : সে রাতে পূর্ণিমা ছিল

আমাদের সকাল ডেস্ক :
                                        উপন্যাসের মঞ্চভ্রমণ : সে রাতে পূর্ণিমা ছিল
                                                                            -শাহাদৎ রুমন

 

বাংলা সাহিত্যে ঐশ্বর্যমন্ডিত এক উপন্যাস সে রাতে পূর্ণিমা ছিল। এই আখ্যানে বিরাজিত আছে ধ্রুপদী বাংলা সাহিত্যের চেতনার স্ফূরণ, আধুনিক মানুষের জীবন-যন্ত্রণা এবং সমাজ মানুষের নানা সংকটের চিত্র। বিশেষত প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যে অভেদাত্মক রূপ প্রবাহমান ছিল- শহীদুল জহির স্বীয় উপন্যাস সে রাতে পূর্ণিমা ছিলতে তাই প্রস্ফুটিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। বলা বাহুল্য, সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসের গড়নে বিশ্বখ্যাত কথাসাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদুবাস্তবতার প্রত্যক্ষ প্রভাব প্রতিফলিত হলেও ‘সামষ্টিক চেতনা’ প্রবাহে দার্শনিক ভিত্তি নির্মাণে বদ্ধ পরিকর শহীদুল জহির; যা এ দেশজ মানুষের ধ্রুপদী দার্শনিক চিন্তা-চেতনার প্রকাশক। এমনকি উপন্যাসটির কাহিনির মধ্যে দ্বন্দের আসা-যাওয়ার চিত্রও তো এ দেশজ ধ্রুপদী নাট্যশিল্প ভাবনার সমার্থক- যা আরশিনগর-এর প্রথম প্রযোজনা সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’র মধ্যেও প্রত্যক্ষ করা যায়।

 

সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসটির মঞ্চায়নে নির্দেশক রেজা আরিফ মূলত নাটকের তিনটি উপাখ্যানকে (আকালুর কুড়িয়ে পাওয়া শিশু এবং তাকে বিবাহ করা, মফিজউদ্দিন মিয়ার জন্মবৃত্তান্ত, বিবাহ এবং মোল্লা নাসিরউদ্দিন-দুলালির প্রণয় ও পরিণতি) দৃশ্যায়িত করেন। কারণ সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসটি সম্পূর্ণাঙ্গ মঞ্চায়নে নাট্যদৈর্ঘ্য যথেষ্ট প্রলম্বিত হবে- তা নিঃসন্দেহ। ফলে স্বাভাবিকভাবেই নির্দেশক একজন মফিজউদ্দিনের- মফিজউদ্দিন মিয়া হয়ে ওঠা এবং তার পরিণতির মৌল আবহকেই দৃশ্যায়নের জন্য বেছে নেন। নাট্যপ্রযোজনায় লক্ষ করা যায়, মিয়া বাড়ির কামলা আকালুর ছেলে মফিজউদ্দিন একসময় মফিজউদ্দিন মিয়া হয়ে ওঠে এবং ঘটনাক্রমে তারই ছেলে মোল্লা নাসিরউদ্দিনের প্রণয়ে বাধা পড়ে জোলা মোবারক আলির কন্যা দুলালি। অথচ মফিজউদ্দিন অতীত ভুলে গিয়ে মোবারক আলির মেয়ে দুলালিকে পুত্রবধু করতে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদিকে নাসিরউদ্দিনের বিরহে উন্মাদ প্রায় দুলালির জীবন পরিক্রমা এক সময় বিয়োগান্তক পরিণতিতে সমাপ্ত হয়। ফলে, নির্দেশক রেজা আরিফ অনেকাংশে দুলালির মৃত্যুকে একীভূত করেন মফিজউদ্দিন মিয়ার সপরিবারের খুন হওয়ার পেছনের ভাগ্যসূত্র হিসেবে। কারণ তিনি মফিজউদ্দিন দুলালিকে পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ না করে প্রকারান্তরে যে অন্যায় করে- তাই অনেকাংশে তার পরিবারের বিয়োগান্তক পরিণতির পেছনের সূত্ররূপে চিহ্নিত করেন বলে ধারণা করা যায়। এমনকি নাট্যপ্রযোজনার সমাপ্তিও তিনি দুলালির মৃত্যু-দাফনের অব্যবহিত পরই চিহ্নিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।

 

সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসটির নির্মাণে শহীদুল জহির যে জাদুময়তা তথা বিভ্রান্তির কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন- তা ধ্রুপদী নাট্যশিল্প মহিমায় উদ্ভাসিত। অর্থাৎ নাট্যশিল্পের অন্যতম আধার হলো ‘নাটকীয়তা’র সৃষ্টি। যে নাটকীয়তার নানামাত্রিক উপস্থাপনা শহীদুল জহির স্বীয় উপন্যাসের করণকৌশলে অঙ্গীভূত করেছেন অবলীলায়। আখ্যানটির প্রধানতম চরিত্র মফিজউদ্দিন মিয়ার জন্ম ও মৃত্যুর সময়ে চাঁদ তথা পূর্ণিমার উপস্থিতি বিষয়ক গ্রামবাসীদের আলাপচারিতায় কাহিনির সূত্রপাত। যদিও পাঠক প্রথমে জানেন মফিজউদ্দিনের মৃত্যুকালীন (হত্যাকা-ের রাতে) পূর্ণিমার প্রভাবের কথা। কাহিনি পরিক্রমায় জ্যোৎস্নার এই বিশাল বিস্তার তোরাপ আলিসহ সুহাসিনীর গ্রামবাসীদের সঙ্গে পাঠকও লক্ষ করেন। তবে চাঁদের প্রভাবের এই নিমর্মতাকে হিসেবে নিয়ে গ্রামবাসীরা স্থির সিদ্ধান্তে আসে যে, মফিজউদ্দিনের জন্ম রাতের চাঁদ ছিল ‘গ্রহণের চাঁদ’। এ ভাবেই জন্ম-মৃত্যুর মধ্যিখানে কামলার ছেলে মফিজদ্দি’র- মফিজউদ্দিন মিয়া হয়ে ওঠা ও ব্যক্তি এবং সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের কাহিনি ক্রমশ এগিয়ে য়ায়। তবে এ কাহিনি সময়ের ঐক্যকে মান্য করে না। বরং ঐতিহ্যিক বাংলা নাটকের ‘এই কথা থাক এই খানে পরিয়া… চলুন দেখে আসি ঐখানে ওমুকের তমুক ঘটনা’- এমন বৈশিষ্ট্যের আধারে এগিয়ে যায় বহুবিধ ঘটনার সম্বনিত কাহিনিভাগ। তৎসঙ্গে নাটকীয়তার প্রবাহে পাঠক জানতে পারেন, গরিব আকালু ও তার কুড়িয়ে পাওয়া বোবা মেয়ের গল্প; যাকে আকালু প্রথমে কন্যা হিসেবে লালন-পালন করলেও একসময় প্রেমের টানে কিংবা মেয়েটির সামাজিক নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজেই বিয়ে করে ঘরে তুলে। তাদেরই সন্তান মফিজউদ্দিনের বেড়ে ওঠা, রাতের আধাঁরে চন্দ্রভানের রূপে মুগ্ধ হওয়া, যমুনার বুকে গণিকা নয়নতারার আমরণ কৌশলের কারণে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া, নয়নতারার নামে একটি বাজারের পত্তন করা, আলি আকবর মিয়ার কন্যা চন্দ্রভানকে বিয়ে করা, স্ত্রী চন্দ্রভানের উপর জ্বীনের প্রভাবজাত বিশ্বাস, ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া, একাদশতম সন্তান মোল্লা নাসিরউদ্দিনের মোরগ খাসি করা, গ্রাম্য তাঁতী মোবারকের কন্যা দুলালির সঙ্গে নাসিরউদ্দিনের সম্পর্ক, দুলালির মৃত্যু ও দাফন, শিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা ছেলে আবুবকর সিদ্দিক এবং ছেলের বউ আলেকজানকে ঘিরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১১১ বছর বেঁচে থাকার কথা বলে বেড়ানো মফিজউদ্দিনের ৮১ বৎসর বয়সে সপরিবারের নিমর্ম হত্যাকা-ের শিকার হওয়া ইত্যাকার নানাবিধ রহস্যাবৃত ঘটনার অভ্যন্তর দিয়ে শহীদুল জহির অনেকটা নাটকীয় কৌশলেই পাঠককে মোহাচ্ছন্ন করে রাখেন বলা যায়। উপন্যাসে আবর্তিত উপর্যুক্ত ঘটনামালার বিচ্ছিন্ন যাতায়াতও নাটকীয়ভাবে কাহিনির অপ্রয়াস অগ্রগতিকে উন্মোচন করে পাঠক সমীপে। কারণ মূল কাহিনির অভ্যন্তরে এরূপ উপকাহিনির সংযুক্তি ঐতিহ্যিক বাংলা গেয়-কাব্যের নান্দনিকতার সমতুল্য। এমনকি এই আখ্যানটির অভ্যন্তরে বিরাজমান মানব বেদনার আর্তি-গভীরতা, দৃশ্য ও নাট্যময়তা, বোধের বিশালতা এবং করণকৌশল ও রসের মধ্যে যে দ্বৈতাদ্বৈত চিহ্ন- তার মধ্যেও অস্তিমান ‘নাটকীয়তা’র মোহাচ্ছন্নতা। তাছাড়া চাঁদ প্রভাবিত মফিজউদ্দিনের পরিবারের এসব ঘোর-লাগা ঘটনা সুহাসিনীর মানুষের মতো পাঠক হৃদয়েও এমন এক ঘোর তৈরি করে যে, পাঠক এক বসায় উপন্যাসটি শেষ করতে চায়। সেই সঙ্গে এ সকল ছোটো ছোটো রহস্যাবৃত ঘটনার সন্নিবেশ একজন সৃষ্টিশীল পাঠকের কাছে পাঠক্রিয়ার সময়ই ইঙ্গিতময় নাট্যাঙ্গিকের ধারায় অনায়াসে উপলব্ধ হতে সক্ষম। উপরন্তু, উপন্যাসটির মঞ্চায়নে নির্দেশক রেজা আরিফ নাট্যসময় বিবেচনায় আকালুর কুড়িয়ে পাওয়া শিশু এবং তাকে বিবাহ করা, মফিজউদ্দিন মিয়ার জন্মবৃত্তান্ত, বিবাহ এবং মোল্লা নাসিরউদ্দিন-দুলালির প্রণয় ও পরিণতিজ্ঞাপক তিনটি উপাখ্যানকে দৃশ্যায়িত করেন। তারপরও নাট্যরস আস্বাদনে দর্শককে বিভ্রান্ত হতে হয় না, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ কাহিনিসমেত নাট্যপ্রযোজনা উপভোগেই সমর্থ হয় তারা।

 

একটি মঞ্চনাটকের দৃশ্যায়নে সাধারণত কাহিনি, চরিত্র, দ্বন্দ্ব, সংলাপ, দৃশ্যময়তা, গান, নৃত্য ইত্যাকার বিষয়গুলোর সমাহার থাকা আবশ্যক বলে বিবেচ্য। উপরোক্ত বিষয় ছাড়াও বাংলা ঐতিহ্যিক নাটকের প্রাণ ‘বর্ণনা’ তথা ‘কথা’ অন্যতম প্রধান নাট্যগুণ হিসেবে চিহ্নিত। আলোচ্য প্রযোজনায় নির্দেশক রেজা আরিফ সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসে বিরাজমান বর্ণনার অমিতশক্তিকেই দৃশ্যায়ন করেন ঐতিহ্যিক নাট্যাঙ্গিকের অনুষঙ্গে। বলা যায়, বর্ণনার সঙ্গে উপন্যাসের দৃশ্যময় কাহিনির বিন্যাস, বহুধা বিচিত্র মানুষের চরিত্র আর তাদের জীবনের নানান দ্বান্দ্বিক ঘটনার সংশ্লেষ, সংলাপের অপ্রয়াস যাতায়াতের নান্দনিকভাষ্যে নির্দেশক রেজা আরিফ ‘উপন্যাসের মঞ্চভ্রমণ’ শৈলীর রূপ প্রতিফলিত করেন আধুনিক নাট্যমঞ্চে। উল্লেখ থাকে যে, নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকৃত কাঁদো নদী কাঁদো উপন্যাসের মঞ্চায়নের মাধ্যমে এই অভিধাটির কথা ব্যক্ত করেছিলেন। তাঁর মতে, একটি উপন্যাসকে নাট্যরূপ প্রদান কিংবা পাশ্চাত্যের নাট্যশৃঙ্খলায় রূপায়িত করার পরিবর্তে হুবহু মঞ্চে দৃশ্যমান করা হলো উপন্যাসের মঞ্চভ্রমণ। আরশিনগরের প্রযোজনা সে রাতে পূর্ণিমা ছিল তারই ধারাবাহিক প্রতিফলন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কারণ প্রযোজনাটির মধ্যে কোরিওগ্রাফি ও সংগীতের সংযোজন হলেও মূল উপন্যাসকেই দৃশ্যায়িত করা হয়েছে। তবে একথা না বললেই নয় যে, নির্দেশক রেজা আরিফের নির্দেশনাশৈলীটি গড়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যাঙ্গিকের সঙ্গে চরিত্রাভিনয়, পজেটিভজম, ফিউচারিজম এবং বায়োমেকানিজমের ফিউশনে; যার চিত্র সে রাতে পূর্ণিমা ছিল প্রযোজনাটির মধ্যে বিশেষভাবে প্রস্ফুটিত। কারণ তিনি থিয়েটারের দর্শককে মানবিক তাড়নায় জারিত করতে চান, তাঁর চাওয়া বর্তমান সমাজের চারপাশে বিদ্যমান নানাবিধ দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক মানবচেতনা। এ কারণেই তাঁর মাকড়সা, রহু চন্ডালের হাড়, কেরামতমঙ্গল, কারবালার জারি প্রভৃতি প্রযোজনার মতই সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’র মাঝেও কখনো কখনো ক্রন্দন, হাউলিং এবং মিউজিক-এর প্রাবল্য চরিত্রাবলীর সংলাপকে আড়াল করে দেয়। আবার একথা না বললেও নয় যে, নির্দেশক রেজা আরিফ বর্তমান সময়ে প্রতিষ্ঠিত হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির বর্ণনাত্মক নাট্যাঙ্গিকের ভিন্নরূপ নির্মাণে প্রয়াস চালিয়ে আসছেন। ফলে, তাঁর নির্দেশিত সে রাতে পূর্ণিমা ছিলসহ বিভিন্ন প্রযোজনায় ঐতিহ্যিবাহী বাংলা নাট্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে কাপড়, বাঁশের কাঠি প্রভৃতির নানামাত্রিক ব্যবহার দৃষ্ট হয়। এককথায়, সে রাতে পূর্ণিমা ছিল প্রযোজনার নির্দেশক প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য নাট্যভাবনার সমন্বয়ে আধুনিক বর্ণনাত্মক বাংলা নাট্যের স্বকীয়রূপ নির্মাণে ব্রত- এমত ব্যক্ত করা ভুল নয় বলে বর্তমান নিবন্ধকারের অভিমত।

 

বস্তুত, প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য তথা গেয়-কাব্যের মৌল রূপটি ছিল ‘ইতোপূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনায়ন’-এর অভ্যন্তর দিয়ে প্রকাশিত। অর্থাৎ ঘটে যাওয়া কাহিনির পরিবেশনাই ছিল প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা নাটকের মৌল প্রবণতা। সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসটির সামগ্রিক কাহিনিও সংগঠিত হতে দেখা যায়- ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনাধর্মীতায় প্রসৃত। সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাস ও নাট্যপ্রযোজনায় লক্ষ করা যায়, তোরাপ আলি নামক এক বৃদ্ধ- মহির সরকারের উঠোনে বসে একটি পরিবারের বিচিত্র সব ঘটনার বয়ান করে যায়। ফলত নাট্যপ্রযোজনা এবং উপন্যাসের কাহিনি-ভাগ অনেকাংশেই ধ্রুপদী বাংলা নাট্যিক কৌশলের প্রধানতম রীতি বর্ণনাধর্মীতায় শৃঙ্খলিত বলে ধারণা ব্যক্ত করা যেতে পারে। অন্যদিকে, মধ্যযুগের বাংলা নাট্যরীতি কথকথা, কিচ্ছাকথন এবং বৈঠকীর বিন্যাস ক্রিয়ার সাযুজ্যকরণও আলোচ্য কাহিনি পরিক্রমায় সুস্পষ্টভাবে দৃষ্ট। এক কথায়, তোরাপ আলির একের পর এক ঘটনা বর্ণনা কেবল দৃশ্যের গ্রন্থণে সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেনি, বরং এই উপন্যাসের মফিজউদ্দিন, নয়নতারা, চন্দ্রভান, নাসিরউদ্দিন, দুলালি, আলেকজান প্রমুখ চরিত্রের মতই ‘বর্ণনা নিজেই এই রচনার একটি প্রধান চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়’।

 

বলা যায়, বর্ণনার বিচিত্র শক্তির প্রয়োগের অভ্যন্তরেই জাগ্রত আছে সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাস ও নাট্যপ্রযোজনার শিল্প মহিমা।

 

বলা আবশ্যক, ‘শিল্প মানুষের সৃষ্টি, সেই সৃষ্টি যেমন (যেমন হওয়া উচিত তেমন নয়)’ তাই অ্যারিস্টটলের মতে শিল্প পদবাচ্যে স্বীকৃত। এমনকি অ্যারিস্টটল কাব্যতত্ত্বে একথাও বলতে চেয়েছেন, ‘আমরা কাব্যে দেখি জীবন যে রকম, জীবন যেমন হওয়া উচিত (বা আর্দশায়িত রূপ), আর জীবনের হীনতর রূপ, বা যে জীবন আমরা চাই না।’ অর্থাৎ কাব্য তথা শিল্পে জীবনের রূপ নানাভাবে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে- যা অ্যারিস্টটল স্বীয় শিল্পতত্ত্বে বলার প্রয়াসী। কিংবা বলা যায়, শিল্পে আমরা সেই জীবন দেখতে চাই- যা বাস্তবে পেতে চাই না; নতুবা জীবন যে রকম সে রকম নয়। এ কথার এক মহৎ প্রায়োগিক ভাবনার প্রকাশ দৃষ্ট হয় সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসের দৃশ্যায়নে। সহজভাবে বলা যায়, বাস্তবের মতো অথচ বাস্তব নয়- এমনতর কাহিনি নির্মাণে যে শিল্পের নির্যাস মানুষ পেতে চায়, তাই বিধৃত আছে সে রাতে পূর্ণিমা ছিল নাট্যপরিক্রমায়। ফলে, কাহিনিতে ঘটমান ঘটনাগুলো অতীব পরিচিত অথচ অচেনা ও অপ্রত্যাশিতভাবে পাঠক-দর্শকের চেতনার মর্মমূলে করাঘাত করে। এছাড়া মানব জীবনবাস্তবতায় জড়িয়ে থাকা যৌনতার বিষয়টি যে মহৎ ভাবনায় উপন্যাসে শহীদুল জহির বিবৃত করেন- তা নাট্যপ্রযোজনায় অভিনয়শিল্পীদের অভিনয়গুণে নান্দনিক শিল্পমহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। যদিও একথাও বলতে হয় যে, প্রযোজনায় বিরাজমান যৌনতার প্রসঙ্গটি কোনো কোনো দর্শকের নিকট ‘অশ্লীল’ বলে পরিগণিত হতে পারে। উপরন্তু, যে দর্শক সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসটি পাঠ এবং অভিনয়শিল্পের নন্দনভাবনার সঙ্গে পরিচিত সেই দর্শকের কাছে নাট্যপ্রযোজনায় অশ্লীলতা নয় বরং অভিনেতার অভিনয় পারদর্শিতার চিত্র দীর্ঘদিন যাবৎ হৃদয়ে জাগ্রত থাকবে বলেই আশা করা যায়। তাছাড়া শিল্পে জীবনবাস্তবতায় জড়িয়ে থাকা যৌনতার শ্লীলতার যে প্রতিরূপ যুগ যুগ ধরে প্রতিফলিত হয়ে আসছে- তা সৃজনমুখর পথপরিক্রমায় অশ্লীলতারূপে কেবলমাত্র বিনোদনের মোক্ষলাভে আগত দর্শকের কাছেই অনুভূত হতে পারে। কিন্তু, একজন শিল্পপ্রেমী, শিল্পের রসাস্বাদনে সমর্থ দর্শকের কাছে তা অশ্লীলতা নয় শ্লীলতা নয় বরং কেবল শিল্পের নির্যাসরূপেই বিচারযোগ্য হবে- এমন ধারণা অমূলক নয়।

 

সে রাতে পূর্ণিমা ছিল নাট্যপ্রযোজনায় স্বল্পায়তনের সেট ব্যবহার করা হয়েছে। একটি নৌকার সাজেশন মঞ্চের দুটি কোণে কৌণিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। যা একাধারে অভিনয় সহায়ক সেটরূপে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। তৎসঙ্গে অভিনয় সহায়ক হিসেবে মঞ্চের উপরিভাগ থেকে ঝুলন্ত লাল, নীল ও হলুদ কাপড় ব্যবহার করার দৃশ্য অবলোকন করা যায়; যা সত্যিকার অর্থেই নান্দনিক। অন্যদিকে, পোশাক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের চরিত্রনিরপেক্ষ পোশাকরীতিকে প্রাধান্য দেয়া হলেও চরিত্রানুযায়ী কস্টিউমও ব্যবহার করা হয়েছে প্রযোজনার নান্দনিক উৎকর্ষতা বিবেচনায়। কারণ সে রাতে পূর্ণিমা ছিল নাট্যপ্রযোজনার অভিনয়রীতি গড়ে ওঠেছে বাংলা বর্ণনাত্মক ও চরিত্রাভিনয়রীতির সমন্বয়ে। যার ফলে অভিনয়ক্ষেত্র মূল মঞ্চসহ দর্শক আসন পর্যন্ত বিস্তৃত বলে অনুমান করা যায়। এছাড়া প্রযোজনার সংগীত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মিউজিকের ফিউশন করা হয়েছে- যা নাট্যআবহকে বোধগম্য রূপে প্রকাশে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে অনেকাংশেই। তবে, গত ১৪ অক্টোবর ২০১৪ তারিখের প্রদর্শনীর অন্তিমে সদ্যমৃত দুলালির পিতা মোবারক আলির কণ্ঠে গীত ‘বহু দিনকার পিরিতগো বন্ধু, একই দিনে শেষ কইরো না’ গানটি অসামঞ্জস্য এবং বেমানান বলে অনুভূত হয়েছে বর্তমান নিবন্ধকারের কাছে। এছাড়া কোরিওগ্রাফি পরিকল্পনায়ও নাট্যআবহকে প্রতিফলিত করার চিত্র অনুধাবন করা যায়।

 

সে রাতে পূর্ণিমা ছিল প্রযোজনার অভিনয়রীতিটি বাংলা বর্ণনাত্মক ও চরিত্রাভিনয়রীতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠায় একই চরিত্রে ভিন্ন ভিন্ন অভিনেতার অভিনয়শৈলী এবং একজন অভিনেতার বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় কুশলতা প্রযোজনাটির নান্দনিকতা রূপে দর্শক হৃদয়ে আচর কেটেছে। পাশাপাশি বাংলা নাট্যমঞ্চে দুলালি, নয়নতারা, তোরাপ আলি, মোবারক আলি, মফিজউদ্দিন চরিত্রে অভিনয়কারী রূপা, মৃন্ময়ী, ইভান, পার্থ’র অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততা মন্ত্র মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে রাখে দর্শককে একথাও স্বীর্কায। তারপরও একজন দর্শক, ক্ষুদে সমালোচক হিসেবে আশা করি, নির্দেশক রেজা আরিফ পরবর্তী মঞ্চায়নে শিল্পীদের অভিনয়, সুবিন্যস্ত যন্ত্র-সংগীতের পাশাপাশি সংলাপ প্রক্ষেপণের প্রতি আরো মনোযোগী করে তুলবেন। সেই সঙ্গে সুকল্পিত আলোক-প্রয়োগ এবং দলীয় গান-নৃত্যের প্রতি সকল অভিনেতাদের একাগ্রতা তৈরির প্রতিও দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখবেন বলেই বিশ্বাস। কারণ আধুনিক থিয়েটার শিল্পটি শেষাবধি নির্দেশকের শিল্প। যেখানে অভিনেতা একটি অপরিহার্য উপাদান। এই উপাদানটির যথাসাধ্য ব্যবহার ও স্ফূরণ- নির্দেশকৃত কৌশলের নান্দনিকতারই প্রতিফলন।

 

থিয়েটার শেষাবধি দৃশ্যের শিল্প। কারণ থিয়েটারের নিজস্ব ভাষা দৃশ্যায়নের উপর নির্ভরশীল। নাটকীয়তায় পূর্ণ নানা দৃশ্যময় বর্ণনা ও ঘটনার যে সন্নিবেশ সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসে বিদ্যমান – তা দৃশ্যায়নে রেজা আরিফ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ফলে, প্রযোজনাটির সকল ঘটনা আর দৃশ্যের দৃশ্যায়নে থিয়েটারের নিজস্ব ভাষা-সৌকর্যের ঐকতান লক্ষ করা যায়। তৎসঙ্গে ঐতিহ্যিক বাংলা নাট্যের নানা উপাদানের সমন্বয়ে আলাদা এক নাট্যভাষার সাক্ষাৎ পাওয়া যায় সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসটির দৃশ্যায়ন পরিক্রমায়। ফলে, শহীদুল জহিরের সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসের নাট্যায়নে বিরাজমান মহাপ্লাবিত দৃশ্যময়তাকে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন বিবৃত উপন্যাসের মঞ্চভ্রমণ শৈলীর অমিত সম্ভাবনার দ্বার হিসেবে অভিহিত করা যায়।

 

 

 

আমাদের সকাল/সোহেল রানা

Share Button
সম্পাদক: রিনি জাহান
নির্বাহী সম্পাদক : মো. কাইছার নবী কল্লোল
যোগাযোগ : ১/এ, (২য় তলা), পুরানা পল্টন লেন, ঢাকা-১০০০
ফোন নম্বর : ০১৬২১০৩৫২৮৯, ০১৬৩৪৭৩১৩৪২
Email: amadarshokal24@gmail.com