এখন সময় :
,
PopularITLtd.com
মেনু |||

আলব্যের ক্যামুর উপন্যাস ‘দ্য আউটসাইডার’ অবলম্বনে কায়া

আমাদের সকাল ডেস্ক :

আলব্যের ক্যামুর উপন্যাস ‘দ্য আউটসাইডার’

             অবলম্বনে কায়া

 

আলব্যের ক্যামু ও নাটক প্রসঙ্গে

 

বিখ্যাত ফরাসি লেখক আলব্যের ক্যামু ১৯১৩ সালের ৭ নভেম্বর ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। একাধারে লেখক, সাংবাদিক, দার্শনিক ক্যামু তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৫৭ সালে অর্জন করেন নোবেল পুরস্কার। বিংশ শতাব্দীতে যে কয়েকজন মুষ্টিমেয় সাহিত্যিক বিশ্বকে নানা মাত্রায় প্রভাবিত করেছিলেন ক্যামু সেই বিরলপ্রজদের একজন। ‘দ্য আউটসাইডার’ এই লেখকের সম্ভবত জনপ্রিয়তম উপন্যাস, ফরাসি ভাষার যার নাম ‘লেত্রঁজে’। এটি ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ নামেও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সর্বপ্রথম ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয় এই উপন্যাস। ক্যামু নিজেকে অস্তিত্ববাদী বলে বিবেচনা না করলেও তাঁর প্রতিটি লেখায় অস্তিত্ববাদ ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের প্রবল উপস্থিতির খোঁজ পাওয়া যায়। সেইসঙ্গে অ্যাবসার্ড, নিয়তিবাদ, ন্যাচারালিজম ইত্যাদি মতবাদের দ্বান্দ্বিক প্রাবল্যও লভ্য। ১৯৬০ সালের ৪ জানুয়ারি মাত্র ৪৬ বছর বয়সে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। বাংলা ভাষায় ক্যামুর ‘দ্য আউটসাইডার’ বিভিন্ন সময়ে নানা ব্যক্তির হাত ধরে অনূদিত হলেও মঞ্চনাটকের রূপে হাজির হচ্ছে সম্ভবত এই প্রথম। তবে নাটক নির্মাণের সময় আমি সর্বতোভাবে ক্যামুর প্রতি অনুগত থাকিনি, তাতে আমার নিজস্ব ভাবনা, বিশ্বাস এবং দৃষ্টিভঙ্গিকেও হাজির করেছি। এ একজন স্বাধীন শিল্পীর অধিকার। নাটকটি আমারই লেখা ‘ক্ষণজন্মা আলো চিরন্তন অন্ধকার’ শীর্ষক একটি গল্পের সংযোজন ঘটিয়ে শেষ করেছি, যাতে প্রতীকের আশ্রয়ে এর সমকালীনতার অপর একটি চিত্রভাষ্য নির্মিত হয়। পাশাপাশি আপাত বৈপরীত্যের মধ্যদিয়েও নিগূঢ় যে ঐক্য সেই রহস্য উন্মোচনেও পাঠক-দর্শক হয়ত গুপ্তধন খোঁজার রোমাঞ্চটুকু অনুভব করতে পারবেন, এই বিশ্বাস থেকে। ক্যামু নামকরণে যে বিযুক্তির আশ্রয় নিয়েছেন আমি বিপরীতে আরো সংলগ্ন করেছি। আপাতত এই। বাদবাকি বিবেচনা আপনাদের। এ বছর পূর্ণ হচ্ছে আলব্যের ক্যামুর জন্মশতবর্ষ। এই রচনা মহান ওই লেখকের প্রতি অর্বাচীন এক লেখকের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের স্মারক হয়ে থাক।

 

আলব্যের ক্যামুর উপন্যাস ‘দ্য আউটসাইডার’ অবলম্বনে কায়া

 

বৃদ্ধাশ্রম গমন

 

কাফন সাদা একটি দালান। তারই সামনে কিছু অংশজুড়ে বাগান। আমি যখন এই দালানের কাছে এসে দাঁড়াই তখন সূর্য ডুবুডুবু। তবু ঈষৎ বিষণ্ণ হলুদলালচে রঙ পুরো আকাশ ছেয়ে আছে। কাফনসাদা দালানটিতেও তারই আভা জড়ানো। ম্রিয়মাণ। কিংবা হয়ত এই দালানেরই এক বাসিন্দা আজ গত হয়েছে বলে আমারই মনের অভ্যন্তরে বিষণ্ণ আর গুমোট রঙে আঁকা কল্পিত কোনো চিত্র আমি এই মুহূর্তে আরোপ করে দিয়েছি। মৃত্যুর সঙ্গে বিষণ্ণ, বিপন্ন আর ম্রিয়মাণের সম্বন্ধ চিরকালের, তাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ সবকিছু ছাপিয়ে কয়েকঘণ্টার একঘেয়ে অনিচ্ছুক বাসজার্নিতে নিজেকে বেশ ক্লান্তই লাগছে। এখন একটু বিশ্রাম নিতে পারলে, কিংবা কড়া একমগ কফি অথবা কয়েক পেগ অ্যালকোহল পেটে চালান করে দিতে পারলে বেশ হতো। এই ভাবনায় মনে খানিক স্ফূর্তি ভিড় করতে চাইলেও পরক্ষণেই একটি গম্ভীর কণ্ঠের ডাকে বাস্তববোধ মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়ায়। মনে পড়ে, এই সময় এ ধরনের ভাবনা ঠিক সমীচীন নয়।

: ভেতরে আসুন।

 

তখনই মনে পড়ল, আমি এতক্ষণ আসলে গেটের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। এখানে বেশ কয়েকবার আসা হয়েছে। তাই লোকটি আমাকে চিনতেই পেরেছে বোধ হয়। নইলে প্রশ্ন করল না কেন? কোত্থেকে এসেছেন, কী সমাচার? কার সঙ্গে দেখা করবেন? ইত্যাদি ইত্যাদি। পথ দেখিয়ে নিয়ে চলা লোকটি হাঁটছে খানিকটা নুয়ে। হয়ত বয়সজনিত কারণে। তার হাতে একটি লণ্ঠন। দীর্ঘ সাদা আলখাল্লার মতো পোশাক পরিহিত সম্মুখে অগ্রসরমাণ লোকটি পেছন ফিরে তাকানোরও প্রয়োজন বোধ করল না। যেন সে নিশ্চিত, তাকে অনুসরণ করবই আমি।

 

পড়ন্তবয়সী মানুষের আবাস এটি। বৃদ্ধাশ্রম। বছর তিন আগে এই আশ্রমেই রেখে গিয়েছিলাম মাকে। আমি লোকটির পেছন পেছন এসে দাঁড়াই সাদা দালানের ভেতরে একটি কক্ষের সামনে। খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে তাকালে কালো পর্দার আড়াল ভেদ করে কফিনটির কিছু অংশ চোখে পড়ে। সেখানে শায়িত আমার মা। মারা গেছেন।

 

ম্যরসল : লাশ কি এখন দেখা যাবে?

 

দারোয়ান : না। খানিক সময় অপেক্ষা করতে হবে। এখানকার ওয়ার্ডেনের সঙ্গে দেখা করার পর আপনি লাশ দেখার অনুমতি পাবেন। এ মুহূর্তে তিনি ব্যস্ত আছেন। অপেক্ষা করতে হবে একটু।

 

আমি সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। অন্ধকার নেমে এল বলে। এতক্ষণ বাগানে হাঁটাহাঁটি করতে থাকা বেশ কয়েকজন বয়স্ক মানুষ ধীরে ধীরে প্রবেশ করে দালানে। নিজেদের কক্ষের দিকে চলে যায় হয়ত। তাদের গমনপথের দিকে তাকিয়ে একটি কবিতার কথা মনে পড়ে। তাতে জীবনের মোহময়তা আর অর্থহীনতার দ্বন্দ্ব।

 

বৃত্তপুরাণ

 

একটি অলৌকিক বৃত্ত

 

জীবনের শুরু, জীবনের শেষ

 

ফলাফল? শূন্য।

 

কল্পলোকের জড়াজড়ি

 

মুহুর্মুহু চুম্বন আনন্দ

 

কিংবা ঈশ্বর ক্ষমতা, সুবিশাল রেস

 

তারপর?

 

সেই একই পুরনো বৃত্ত

 

সেই একই ধ্রুব শূন্যতা।

 

জীবনের শূন্যতাবিষয়ক ভাবনা

 

মানুষের জীবনের অর্থ আর গন্তব্য আসলে কী? এ ভাবনা বহুকাল তাড়িত করেছে। কোনো কূলে ভেড়েনি উত্তরের খেয়া। শুধু মাঝপথে দুরন্ত ঝঞ্ঝায় আত্মাহুতি দিয়েছে প্রশ্ননাম পাখিরা। ওই পড়ন্ত বয়সের মানুষগুলো আজ এসে দাঁড়িয়েছে জীবনের শেষবিন্দুটি স্পর্শ করবে বলে। হয়ত তার অর্থ আছে, হয়তবা নেই। আজ আর ভাবি না। শুধু জানি, বেঁচে থাকাতে আনন্দ আছে, যে বেঁচে থাকে পৃথিবী তার, মৃতের জন্য থাকে না কিছুই। এই প্রথম আমি উপলব্ধি করলাম, মায়ের জন্য তবে আর কিছু রইল না। এই প্রথম এক পশলা শূন্যতাবোধ আমাকে গ্রাস করে, এই প্রথম মায়ের অন্তর্ধানে বুকের কোথাও টনটন করে ওঠে।

 

ওয়ার্ডেনের সঙ্গে কথোপকথন

 

ওয়ার্ডেন : ম্যরসল তো আপনিই?

 

ম্যরসল : জ্বী।

 

ওয়ার্ডেন : আপনার মা মাদার ম্যুরসো এই আশ্রমে এসেছিলেন তিন বছর আগে। তাঁর তো আপন বলতে আপনি ছাড়া আর কেউই ছিল না তাই না? আপনার ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলেন তিনি।

 

ম্যরসল : জ্বী। কিন্তু-

 

ওয়ার্ডেন : না না, ঠিক আছে। কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমি আবেদনের সঙ্গে দেয়া সব কাগজপত্র ভালভাবে দেখেছি। তাঁকে ঠিকমতো যত্নআত্তি করার মতো পরিস্থিতি ছিল না আপনার। আর যে পেশায় আপনি রয়েছেন তাতে সেই বাস্তবতাও ছিল না। সে যাক গে। এখানে তিনি যথেষ্ট আনন্দ-যত্ন আর সুখেই সময়টুকু পার করেছেন।

 

ম্যরসল : হ্যাঁ। আমারও তাই মনে হয়।

 

ওয়ার্ডেন : এখানে তিনি সময় কাটানোর মতো বেশ ভালো কয়েকজন বন্ধু পেয়েছিলেন। তাঁরই বয়সী। আর সমবয়সীদের মধ্যে ভাব ভালো হয় জানেন নিশ্চয়। আপনি অল্পবয়সী তরুণ। তাঁকে সঙ্গ দেয়ার জন্য জুতসই নন।

 

তার এই কথায় কিছু সময়ের জন্যে আমার মনে পড়ে অতীতদিনের কথা। মা তখন আমার সঙ্গেই থাকত। সে এক অদ্ভুত বিষয়। যথেষ্ট বড় আমি, নিজেই নিজের দেখভাল করতে পারি। অথচ এরপরও মা আমায় চোখে চোখে রাখতেন সর্বক্ষণ। দুজনের মধ্যে কথা হতো কি খুব বেশি? না। তারপরও বেশ বোঝা যেত। মায়েরা বোধকরি অমনই হয়। ম্যরসলের ভাবনা¯্রােতে তখন দোলা দিতে থাকে সন্তানের জন্য মায়ের অপরিসীম আত্মত্যাগের কতিপয় গল্প। সে ভাবে আত্মজ এই টুকরোটিকে মানবের সৃষ্টির সময় থেকেই পরম যত্নে আগলে রেখেছে নারী। কিন্তু কোন মোহে? প্রাপ্তির সেই সূক্ষ্মরশ্মিটুকুই বা কি? জানে সে তো, সবল পায়ে দাঁড়ানো মাত্র সেও তাকে ছেড়ে যাবে যাপনের টানে। তবে কি বঞ্চনার ইতিহাসে সে এক ব্যাখ্যাহীন রহস্য! তার মনে জাগে, প্রেমে অন্ধ এক ছেলের বহুচর্চিত কাহিনি।

 

মা ও তার প্রেমান্ধ ছেলের কাহিনি

 

কৈশরোত্তীর্ণ ছেলে সবে রেখেছে দুরন্ত যৌবনে পা। যুবক সে। পৃথিবীর সবকিছুতেই মোহাবিষ্টতার আবেশ। ভালো লাগে, সব ভালো লাগে। ভালো লাগে সবুজ বৃক্ষ, রোদ্দুরমাখা নীল আকাশ, শান্ত দিঘির জল, বয়ে চলা নদী, ভালো লাগে। যুবকটি আবিষ্কার করে, এইসব ভালোলাগা ছাপিয়ে কোনো এক সুদর্শনার প্রতি তার ভেতরে তোলপাড় করা কোনো এক অনুভূতির জন্ম হয়েছে। সেই অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার অসহায় লাগে। তার মরে যেতে ইচ্ছে করে, তার চোখজুড়ে আর নামে না স্বস্তির ঘুম। একদিন নিজেই নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়। সে কথা বলে তারই প্রতিবিম্বের সাথে। প্রতিবিম্ব তারই মস্তিষ্কে বেড়ে ওঠা বর্ধিত চিন্তার প্রতিফলন কিংবা হয়ত পৃথক কোনো সত্তা।

 

প্রকৃত : কী হয়েছে আমার? এই কিছুদিন আগেও সবকিছুতেই জাগতো আনন্দ। আজ কেন ফিকে লাগে।

 

প্রতিবিম্ব : তোমার ভেতরে এক অনুভূতির জন্ম হয়েছে, আপাতত তাই অনিবার্য বলে অন্যসব কিছু ম্রিয়মান।

 

প্রকৃত : সেই সুদর্শনার কাছে যেতে ইচ্ছে করে আমার। ইচ্ছে করে তাকে ছুঁয়ে দেখতে। তার সঙ্গে কাটাতে সময়। এই ইচ্ছের তীব্রতা এতই, আমি স্থির হতে পারছি না অন্যকিছুতে।

 

প্রতিবিম্ব : তবে যাও। পূর্ণ কর ইচ্ছে। এখনই সময়। তোমার এই ইচ্ছে বা আকাক্সক্ষার একটি নাম রয়েছে। তাকে বলে প্রেম। নারীর প্রতি পুরুষের প্রেম। যাও, ওই নারীর কাছে খুলে বল তোমার সব কথা, তোমার বাসনার কথা।

 

প্রকৃত : তাই হবে হয়ত। তার সঙ্গ চাই সত্যি, কিন্তু যখন ভাবি, সামনে দাঁড়িয়ে কি বলব আমি? কীভাবে প্রকাশিত হবে বাসনা আমার? তখন জাগে ভয়, ভীরুতা গ্রাস করে সর্বাঃন্তকরণ।

 

প্রতিবিম্ব : ভয় আর আশঙ্কাই প্রেমের তীব্রতার কারণ। ওগুলো না থাকলে এও তো আর সবকিছুর মতোই মামুলি। সাহস সঞ্চয় কর, বল, তাকে তোমার চাই জীবনে, অন্তিমে। বল, তার জন্য পারো সব।

 

প্রকৃত : সে আমার কথায় আস্থা রাখবে কেন?

 

প্রতিবিম্ব : বিশ্বাস নিয়ে বললে, কথা আর কথার ঘেরাটোপে থাকে না বন্দি। তাতে ভর করে এক অপার্থিব ঔজ্জ্বল্য। সেই আভাতেই তার মন রঙিন হবে, স্বস্তি মিলবে, দোঁহে মিলে হবে এক, অভেদ।

 

প্রকৃত : তবে যাই আমি।

 

প্রতিবিম্ব : প্রার্থিতজনার জন্য কোনো কাজে পিছপা নও তো? ভেবে দেখ।

 

প্রকৃত : কখনোই না। তার জন্য পারি সব।

 

অতঃপর সেই যুবক গিয়ে দাঁড়ায় সুদর্শনার মুখোমুখি। সুদর্শনা অবাক হয়ে তাকায়। যুবক বলে, আমার জগতে আনন্দ ছিল, সবকিছুতেই ছিল অকারণ ভালোলাগা। সবুজ বৃক্ষের দিকে তাকিয়ে, আকাশমুখা শুয়ে, নদীর জলে ডুবে ডুবে কাটিয়ে দিয়েছি কত কত সময়। কিন্তু হঠাৎ কি জানি হলো! যখন তোমাকে দেখি, মনে হলো কোনো এক হীরকদ্যুতিতে ঝলসে গেছে চোখ আমার। যেন অন্ধ হয়ে গেছি আমি। জীবন থেকে হারিয়ে ফেলেছি সব ভালোলাগা, অস্থিরতার পায়ে পায়ে এক বন্দি হরিণ। তুমি কি পারো মুক্ত করতে আমায়? সুদর্শনা একচিলতে হাসির রেখা টেনে ঠোঁটে সুধায়, আমি তাকেই দেব ধরা, যে পারে আমার জন্য সব। পারো কি তুমি? প্রেমপিয়াসী যুবা বলে দ্ব্যর্থহীন, পরীক্ষা প্রার্থনীয়। যদি বলো তবে, বাঘের খোলা মুখে রাখতে পারি মাথা, খরস্রোতা নদী দেব পাড়ি পিছু না ফিরে, ঝড়ের মাঝেও রইব অনড় অবিচল। সুদর্শনার চোখে আনন্দের ঝিলিক, ঠোঁটে কাঁপে শব্দের নূপুর। তবে যাও, নিয়ে এসো মায়ের হৃৎপি- তোমার। দেখি কত ভালো বাসো তুমি। যুবক মুচকি হাসে। তাই দেব এনে।

 

যুবক ফিরে আসে বাড়ি। মায়ের সামনে দাঁড়ায়। মা বলে, কি হয়েছে বাছা তোর? কেন আঁধারমাখা মুখ? মা, এক সুদর্শনার জন্য আর আজ বিপন্ন জীবন। সে চেয়েছে হৃৎপি- তোমার। যদি পারি দিতে সেটি তার হাতে, তবেই সে হবে আমার। মা হেসে বলে, নিয়ে যা ছিঁড়ে। তোর আনন্দ-সুখের চেয়ে বেশি কিছু নয় কাক্সিক্ষত কোনোকালে। যুবক খুন করে মাকে, কেটে নেয় হৃৎপি- বুকের গহিন হতে। তালুবন্দি সেই রক্তমাখা হৃৎখ- নিয়ে যুবক ছোটে, তার মুখে-মনে সুপ্তসুখের ঝরনা। এই তো আর কিছু সময়পর সেই সুদর্শনা যে হবে তার। যুবক ছোটে আরো দ্রুত বেগে। অকস্মাৎ পথে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় সে, হাত থেকে খসে পড়ে মায়ের বুক চিঁড়ে আনা পি-। ধূলিসাৎ রক্তমাখা সেই পি-টি হাহাকার করে ওঠে-

 

: খোকা ব্যথা লাগেনি তো তোর!

 

আমার মাকে এই আশ্রমে নিয়ে আসার পর প্রথম কয়েক সপ্তা বেশ কান্নাকাটি করেছে। হয়ত এখানে তার মন স্থির হচ্ছিল না বলে। ফেলে আসা গৃহকোণ খানিকটা তো পোড়াবেই। কিন্তু এরপর ঠিক হয়ে গিয়েছিল। তখন হয়ত আশ্রম ছেড়ে যাবার ভাবনাতেই তার চোখ সিক্ত হয়ে যেত।

 

ওয়ার্ডেন : চলুন, এবার মাকে দেখবেন। আপনার মায়ের কফিনটি পর্দা দিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছে। বোঝেনই তো, কেউ মারা গেলে এখানকার মানুষেরা বেশ কিছুদিন মনমরা হয়ে থাকে। তাতে করে আমাদের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। কেন? তাও নিশ্চয় বুঝতে পারছেন।

 

ম্যরসল : জ্বী পারছি।

 

ওয়ার্ডেন : তাহলে আপনি এখানেই থাকুন। কাল সকালে শেষকৃত্য। সারারাত কফিনের সামনেই কাটাতে পারবেন। আপনারও তো সেরকমই ইচ্ছে, নাকি?

 

ম্যরসল : জ্বী। আমার কোনো সমস্যা হবে না।

 

ওয়ার্ডেন : ও হ্যাঁ, আপনার মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিল, যথাযথ ধর্মীয় নিয়মে তাঁকে যেন সমাহিত করা হয়। আমি সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছি। আপনার পৃথক কোনো ইচ্ছে নেই তো?

 

ম্যরসল : না। তিনি যেভাবে চেয়েছেন সেভাবেই তো হওয়া উচিত।

 

ওয়ার্ডেন : ঠিকই বলেছেন। আমি তবে এখন যাই। সকালে দেখা হবে।

 

ম্যরসল : জ্বী আচ্ছা। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

 

ওয়ার্ডেন : এটা আমার দায়িত্ব।

 

এখানে মায়ের শবদেহমোড়ানো কফিনের সঙ্গেই কাটাতে হবে সারারাত। আমার সঙ্গী পথ দেখিয়ে আনা সেই দারোয়ান। দুজনেই চুপচাপ বেশ কিছুক্ষণ বসে। দারোয়ান সেই যে ঝিম ধরে একই ভঙ্গিতে আছে ভাবলেশহীন, তাতে তেমন কোনো পরিবর্তন নাই। কেবল আমি খানিক উসখুস করে উঠি। সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু মৃতের লোবানমাখা দৃশ্যপটে সিগারেটের চিত্র ঠিক মানানসই হবে কি না, এই নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু কি-ইবা আসে যায় তাতে।

 

দারোয়ান : মৃত্যুর পর মৃতকে তাড়াতাড়ি সমাহিত করা ভালো। বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই শেষ করে দিলে এই নিয়ে আর তেমন ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন পড়ে না। প্রত্যেকেই যায়, যাবে কোন এক সময়। এই নিয়ে মগ্নতা কেবল হতাশাই বাড়ায়।

 

চমকে উঠি আমি। এতক্ষণ যে মানুষটির অস্তিত্ব তেমন রেখাপাত করেনি, সেই হুট করে আমার আগ্রহে ধরা পড়ে।

 

ম্যরসল : কতদিন ধরে আছেন?

 

দারোয়ান : তা প্রায় বছর দশেক তো হবেই।

 

ম্যরসল : কেমন লাগে এখানে?

 

দারোয়ান : বুঝি না। সময়টুকু পার করি আর কি। মাকে ভালোবাসতেন খুব?

 

এমন প্রশ্নে কিছুটা বিভ্রান্তি ভর করে। মাকে সন্তান ভালোবাসবে খুব স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু যখন এই নিয়ে জিজ্ঞাসার মুখোমুখি, তখন নিজের ভেতরেই যেনবা খোঁজ করে চলি, মাকে খুব ভালোবাসতাম কি? কিংবা এমনও মনে হয়, এ ধরনের প্রশ্নের কোনো অর্থ হয় না। তবু নির্বিকার প্রত্যাশিত উত্তরটিই ছোট্ট করে বেরিয়ে আসে।

 

ম্যরসল : বাসতাম বৈকি।

 

দারোয়ান : ওনার বয়স হয়েছিল কত?

 

কিছুটা অস্বস্তি বোধ গ্রাস করে আমাকে। আমি হাতড়ে চলি। মায়ের বয়স? কত হবে? আমি বিরক্ত হই নিজের প্রতি। আসলে আমি মায়ের প্রকৃত বয়স জানি না। অথচ মায়ের বয়স জানব আমি, সেটি কতই না স্বাভাবিক।

 

ম্যরসল : এই ষাটের মতো হবে।

 

দারোয়ান : কিছুক্ষণ পর এখানে আপনার মায়ের বন্ধু যারা তারা আসবে। আপনার সঙ্গেই রাত জেগে কফিন পাহারা দেবে। এখানে কেউ মারা গেলে এরকম রাত জেগে কফিনের পাশে বসে থাকার নিয়ম রয়েছে।

 

তার এই তথ্যে আমার মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় না। উল্টো ঘরটিতে অনেকগুলো বাতি জ্বলে থাকায় চোখের ক্লান্তিতে সেটি আরো পীড়ন হয়ে দেখা দেয়। সবগুলো বাতি জ্বালিয়ে রাখার কী প্রয়োজন ভেবে পাই না। নাকি চিরকালের অন্ধকারে একজন লুপ্ত হবে বলে, শেষ আলোর ঝলকানি তার চোখে ঠেসে দেওয়ার অভিপ্রায় থেকেই বাতিগুলো জ্বালিয়ে রাখা। কিংবা হয়ত অন্ধকারে মৃতের পাশে বসে থাকায় কোনো ভীতির শঙ্কা থেকেই এই আয়োজন?

 

ম্যরসল : কয়েকটা বাতি কি নিভিয়ে দেয়া যায়। চোখ জ্বালা করছে।

 

দারোয়ান : সবগুলো বাতিই একটি সুইচের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়, যে কারণে কোনো একটি নেভানো সম্ভব হবে না।

 

এরই মাঝে মায়ের বন্ধু যারা পড়ন্তবয়সীরা একে একে ঢুকছে ভেতরে। ঘর ভেসে যাওয়া আলোর স্র্রোতে তারা যেনবা সাঁতরে এসে ঢোকে। তবে শব্দহীন। তারা প্রত্যেকেই একটি করে আসন টেনে নেয়, তাও যেন আলতো করে। পূর্ণ খোলা দৃষ্টিতেই তাদের দিকে তাকাই। অথচ দৃশ্যত তারা যেন জীবন্ত কোনো সত্তা নয়। মৃতের সচলরূপ থাকে না। তবে যদি থেকে থাকে তাহলে এমনই হতো বোধ হয়। চোখের ওপর চামড়া ঝুলে আছে, কোটরে বসা মার্বেল, কখনো কখনো আভাস দেয় শুধু। তাদের প্রত্যেকেই কেউ কেউ একযোগে আমার দিকে তাকায়। চোখ দেখি না, শুধু মুখ ঘোরানোর ভঙ্গিটি জানিয়ে দেয়, আমাকে হয়ত ঠিক সহজভাবে নেয়নি কেউ। হঠাৎ হু হু শব্দের উৎস খুঁজে দেখি, এক বৃদ্ধা কাঁদছে। এরা সবাই কি তবে কোনো অভিযোগ বহন করে নিয়ে এসেছে এই মুহূর্তে এই মৃতের ঘরে? মাকে আশ্রমে রেখেছি বলে সেটি তাদের মধ্যে অবহেলার চিহ্ন হয়ে ধরা দিয়েছে? নাকি আমারই গহিনে তা অনুতাপের স্ফীতকায় ফণা হয়ে উঠছে! টের পাই। সেই বৃদ্ধার ফোঁপানো ততক্ষণে থেমে গেছে। এক সময় রাত পেরিয়ে সকাল হয়। পড়ন্তবয়সী সবাই প্রায় ঘুমে। দারোয়ান একসময় তাদের ডেকে তোলে।

 

দারোয়ান : এখন আপনাদের যাবার সময়।

 

অবাক কান্ড, রাতে যাদের চাহনি আমাকে ক্রমশ অপরাধী করে তুলছিল, তারাই একে একে আমার সম্মুখে এসে দাঁড়ায়, হাত মিলায়, তাতে সহমর্মিতার স্পর্শ লেগে ছিল যেন। সকালে শুরুটাই আলো ঝলমলে। আকাশ নির্মেঘ। মায়ের অন্তর্ধানজনিত বাস্তবতা না থাকলে আজ ঘুরে বেড়ানোতে বেশ আনন্দ জাগত। কিন্তু এই মুহূর্তে এ কেমন অসঙ্গত ভাবনা আমার? নিজেকে চোখ রাঙাই। আশ্রমের কিছু দাফতরিক কাজ তখনো বাকি। ওয়ার্ডেনের ঘর থেকে ডাক পড়ে আমার। সেখানে কিছু কাগজপত্রে স্বাক্ষর করার পর ভালো করে তাকিয়ে দেখি, কালরঙা শোকের পোশাক পরেছেন ওয়ার্ডেন।

 

ওয়ার্ডেন : শেষকৃত্যের মানুষেরা অপেক্ষা করছে। একটু পরই তারা আপনার মায়ের কফিনের ডালা বন্ধ করে দেবে। মাকে কি একবার দেখতে চান, শেষবারের মতো?

 

ম্যরসল : প্রয়োজন নেই।

 

ওয়ার্ডেন কিছুটা অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কি ভাবলেন কে জানে। হয়ত আমার এই অনিচ্ছা তাকে ভেতরে ভেতরে খানিক আহত করে থাকবে। কিন্তু মুখের ভাঁজে তার কোনো ছাপ নেই। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতেই কিছুটা উচ্চস্বরে নির্দেশ দিলেন তিনি।

ওয়ার্ডেন : কফিনের ডালাটি এঁটে দাও। আর হ্যাঁ, আমিও যাব তোমাদের সঙ্গে।

 

ম্যরসল : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

 

ওয়ার্ডেন : এটা আমার দায়িত্ব। শেষকৃত্যানুষ্ঠানে শুধু আমি আপনি আর দারোয়ান যাব। আশ্রমের অন্য বাসিন্দারা এখান থেকেই আপনার মাকে শেষ বিদায় জানাবেন। এই অনুষ্ঠানে যাওয়ার নিয়ম নেই তাদের। অবশ্য এই নিয়ম তাদের মঙ্গলের জন্যই করা হয়েছে। কফিনের সঙ্গে রাত জাগার অনুমতি দেওয়া হয় শুধু তারা যেন কষ্ট না পান। কিন্তু মৃতদেহ সমাধিস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াটি তাদের মধ্যে ভীতি আর হতাশার জন্ম দিতে পারে। ওই তো পাদ্রি এসে গেছেন। গির্জাটা এখান থেকে একটু দূরে। হেঁটে যেতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগবে। চলুন, যাওয়া যাক।

 

এক টুকরো কালো কাপড় নিয়ে কফিনবাহক চারজন সামনে এগিয়ে চলে। আমরা জনা কয়েক পেছন পেছন অনুসরণ করি তাদের। ঝকঝকে দিন। কিছুক্ষণ পরই কফিনবাহকেরা রাস্তা ছেড়ে একটি খোলাপ্রান্তরে নেমে যায়। সম্ভবত তারা আড়াআড়ি পথ মাড়িয়ে গন্তব্যের দূরত্ব কমিয়ে নিতে চাইছে। জীবন আর মৃত্যু দুই বিপরীতমুখা অথচ একে অপরকে অনুসরণ করে ছায়ার মতো। কিন্তু কে নেয় কার পিছু? জীবন মৃত্যুর নাকি মৃত্যু জীবনের? অকস্মাৎ এমনতর ভাবনায় চমকে উঠি। সম্মুখে কফিনআবৃত শবকে ঘিরে আমাদের এই যাত্রা কি তবে মৃত্যুরই পিছু নেয়া?

 

ঘুমপাড়ানি গান

 

ঘুমে ভাসো ঘুম খোকা

 

ঘুমঘুমে কেটে যাক

 

কৈশোর যৌবন আর

 

আশাবাদী প্রৌঢ় সময়

 

ঘুমের শরীর থেকে

 

উঠে আসে গান

 

কোন সে গান

 

ছাতাপড়া কণ্ঠের

 

ছেলেধরা গান

 

আদিম ফেরিওয়ালা আবার আসে

 

নতুন মোড়কে সাজায়

 

ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ

 

ঘুমাতুর চোখগুলো

 

তাতে খুলে যায়

 

ঘুমে ভাসো ঘুম খোকা

 

ঘুমঘুমে কেটে যাক

 

কৈশোর যৌবন আর

 

আশাবাদী প্রৌঢ় সময়।

 

মায়ের কফিনটি নামিয়ে দেয়া হয় মাটির অন্ধকার গহ্বরে। এখানেই একজীবনের সকল ইতিহাস নিয়ে অন্তিম শয়ানে ঘুমাবেন অনাদিকাল। শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পালা চুকে গেলে ফেরার একটা তাগাদা এসে ভর করে ভেতরে। বেশ ক্লান্ত লাগছে নিজেকে। বিছানায় শুয়ে একনাগাড়ে অনেকক্ষণ ঘুম যাবার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। এই ঘুম মৃতের নয়, এই ঘুম জেগে থাকার আনন্দে জীবনকে ভরিয়ে তোলার।

 

সমুদ্রসৈকতে মারির সঙ্গে দেখা

 

ঘুম থেকে উঠেই মনে পড়ল, আজ ছুটির দিন। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে মনে হলো, সমুদ্রে সাঁতার কাটতে গেলে মন্দ হয় না। তাতে শরীরের জড়তাও দূর হবে, আর সূর্যের আলোয় ভেতরে জেঁকে বসা গুমোট ভাবটুকু মিলিয়ে যেতে পারে। আলোয় আমার মন ভালো হয়ে যায়, অনেক আলো চাই আমার, অফুরন্ত আলো। দ্রুত বিছানা ছেড়ে সাঁতারে পোশাক হাতে দে ছুট। গন্তব্য- সমুদ্র।

 

সৈকতে মারির সঙ্গে দেখা। আমি যে অফিসে কাজ করি সেখানেই কিছুদিন সেও কাজ করেছে। তখন বেশ খানিকটা আলাপ-পরিচয় ছিল। কিন্তু ঘনিষ্ঠতা হওয়ার আগেই বিদায় নিয়েছিল সে। আজ হঠাৎ তাকে এখানে পেয়ে ভালো লাগে। দুজনই খানিকক্ষণ সাঁতার কেটে এসে তীরের বালিতে শুয়ে পড়ি। পাশাপাশি। ওপরে খোলা আকাশে নীলেরছটা, মন ভালো করে দেয়া রোদ।

 

মারি : দেখেছ? তোমার গায়ের রঙ যতটা না তামাটে হয়েছে আমার হয়েছে তার চেয়ে বেশি।

 

ম্যরসল : অনেক দিন পর দেখা তাই না?

 

মারি : অফিস ছেড়ে দেওয়ার পর তোমার সঙ্গে আর দেখা হয়নি।

 

ম্যরসল : আজ সন্ধ্যেটা আমার সঙ্গে কাটাবে? সিনেমা অথবা থিয়েটার একসঙ্গে দেখতে পারি আমরা।

 

মারি : যাব। কিন্তু তোমাকে বেশ আনমনা লাগছে। ঠিক স্বতঃস্ফূর্ত নও। কেন যেন মনে হচ্ছে, তুমি এখানে নেই। কথা বলছ, সে শুধু বলার জন্যই।

 

ম্যরসল : মা মারা গেছেন।

 

মারি : কবে মারা গেছেন?

 

ম্যরসল : এই তো, গতকাল।

 

আমি আর মারি হলে গিয়ে একটা ছবি দেখলাম। ছবি শেষ করার পর মারি চলে এল আমার ফ্ল্যাটে। দুজনেরই আনন্দময় রাত্রিযাপন। ভোরে মারি চলে যায়। আমারও আর ঘুম আসে না। মা যখন আমার সঙ্গে থাকতেন তখনকার কিছু ঘটনার কথা মনে পড়ে। আজও ছুটির দিন। কিছু করার না পেয়ে পুরনো একটি খবরের কাগজ টেনে নিয়ে পড়তে থাকি। এতে সময় বেশ কেটে যায়। রাতে ঘুমাতে যাই। আবারও মার কথা মনে পড়ে। জীবন্ত একটা মানুষ কী অবাক, হুট করেই চলে গেলেন অদেখা কোন লোকে! তাকে পাঠিয়ে দিয়েছি অন্ধকার এক প্রকোষ্ঠে। মনে পড়ে একদিন আমিও তো ওরকম করেই শূন্য হয়ে যাব, অন্ধকারে লুপ্ত হবে আমার যাবতীয়। বুকের ভেতর কেমন যেন হু হু করে ওঠে। কাল সকাল থেকে আবার চাকরি, আবার ব্যস্ততা। একই নিয়মে চলবে সবকিছু। আমার জীবনের কিছুই তবে বদলায়নি!

 

অন্তঃখনন

 

মনের মাঝে সদাই চলে

 

দহন রোদন খেলা

 

এমনি করেই জানি আমি

 

সাঙ্গ হবে বেলা।

 

অফিসে বসের সঙ্গে কথোপকথন

 

মনিব : কেমন আছেন এখন? ক্লান্ত লাগছে না তো?

 

ম্যরসল : আমি ঠিক আছি।

 

মনিব : তা আপনার মার বয়েস হয়েছিল কত।

 

ম্যরসল : ষাট বছর তো হবেই।

 

সালামানো ও তার কুকুর

 

অফিস থেকে ফেরার পথে বাড়ির নীচেই দেখা হয় সালামানোর সঙ্গে। আমার পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। সে বেরিয়েছে তার পোষা কুকুরটাকে সঙ্গে করে। সালামানো প্রায়ই তার কুকুরটাকে মারধর করে। দীর্ঘ আট বছর ধরে চলছে এরকম। কিন্তু মজার ব্যাপার তারপরও দুটো প্রাণী একসঙ্গে রয়েছে। অভ্যস্ততা। মানুষের সঙ্গে মানুষের একত্রবাসও কি অভ্যাসের বিষয় নয়? যদি তাই না হবে, তবে প্রেমহীনতার পরও মানুষ একসঙ্গে থাকে কি করে? কুকুরটাকে গালাগাল করছে সালামানো, যেমনটা সে সবসময়ই করে থাকে।

 

ম্যরসল : কেমন আছেন? শুভসন্ধ্যা।

 

সালামানো : বেজন্মা কুত্তা একটা।

 

ম্যরসল : আহা, করেছে কি?

 

সালামানো : (উত্তর নেই) শয়তান, হতচ্ছাড়া কুত্তা।

 

ম্যরসল : বললেন না কিন্তু ওটার দোষ কি?

 

সালামানো : ওরকম কুকুর থাকার চেয়ে না থাকা ভালো। উচ্ছন্নে যাক, নরকে গিয়ে পচে মরুক। এত জ্বালাতন করে!

 

রেমন্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎ

 

রেমন্ড: শুনছেন? রাতের খাবারটা না হয় আমার সঙ্গেই খেলেন।

 

আমার পাশের ফ্ল্যাটের অপর বাসিন্দা রেমন্ড। লোকে তাকে খুব ভালো মানুষ বলে মনে করে না। কিন্তু আমার অবশ্য এতে কোনো ছুঁতমার্গ নেই। মানুষটির সম্পর্ক আমার সঙ্গে কেমন সেটাই বিবেচ্য। সচরাচর সৌজন্য বিনিময় ছাড়া ওর সঙ্গে আর কোনো বাড়তি আলাপ হয়েছে বলে মনে পড়ে না। তবু আজ এই সন্ধ্যায় যখন খাবারের নিমন্ত্রণ আসে হুট করেই কোনো উপলক্ষ ছাড়া, তখন একটু দ্বিধা উঁকি দিলেও পরমুহূর্তে ভাবি, কি এমন ক্ষতি তাতে।

 

ম্যরসল : তা খুব একটা মন্দ হয় না।

 

রেমন্ডের ঘরে ঢুকেই দেখি তার হাতে ব্যান্ডেজ। চোখ কুঁচকে একটু তাকাই।

 

ম্যরসল : হাতে কি হয়েছে? ব্যাপারখানা কি খুলে বলুন তো?

 

রেমন্ড : এই একটু মারামারি হয়েছে আর কি। আমাকে যেমনই ভাবুন না কেন, আমি কিন্তু ইচ্ছে করে ঝামেলা পাকানোর মানুষ নই। তবে একটু একগুঁয়ে আর বদরাগী স্বভাব আমার। এটা সত্য। ওই তো, বাসে বাড়ি ফিরছি, ওই লোকটা আমাকে বলে কিনা, সাহস থাকে তো নেমে আসুন। আমি বলি, মাথা গরম করবেন না। আপনার সঙ্গে আমার সমস্যা কি? সঙ্গে সঙ্গে সে বলে বসে, আমি নাকি ভিতুর ডিম। আর যায় কোথায়। বাস থেকে নেমে সোজা লোকটার নামের ওপর একটা ঘুষি ঝাড়লাম। সেও মারতে চাইল। আমিও ক্ষেপে গিয়ে আরো কয়েক ঘা মারলাম। লোকটির মুখ তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বললাম, কি আর প্রয়োজন আছে কিনা। সে মাথা নেড়ে ক্ষান্ত হওয়ার ভঙ্গি করল। দেখুন, আমি কিছুই করিনি অথচ সেধে আমার সঙ্গে লাগতে এল। যাকগে, প্রকৃত ঘটনাটা বলি। আজকের এই মারামারির সঙ্গে সেই ঘটনার যোগ আছে। আর এ ব্যাপারেই আপনার পরামর্শ প্রয়োজন। সেটা যদি আপনি করে দেন, তবে জেনে রাখুন আপনার আজীবনের বন্ধু হব আমি। আমার সঙ্গে বন্ধুত্বে আপনার অসম্মতি নেই তো? বন্ধুত্ব কিন্তু আমার কাছে অনেক বড়। কখনো তাকে ভুলে যাই না।

 

ম্যরসল : আপনার সঙ্গে বন্ধুত্বে অসম্মতি নেই।

 

রেমন্ড : তাহলে বলি। বিষয়টি নারীকেন্দ্রিক। অনেক রাত কাটিয়েছি তার সঙ্গে। তবে সেজন্য যে আমার অর্থ ব্যয় হতো না এমন নয়। প্রতি মাসেই একটা মোটা অঙ্কের অর্থ তার পেছনেই খরচ হতো। আজ যার সঙ্গে মারামারি হলো সে ওই নারীর ভাই। আমি জানি, আশপাশের মানুষ আমাকে ভালো মনে করে না। তাতে অবশ্য আমার কিছু যায় আসে না। যাকগে, এক সময় বুঝতে পারলাম, ওই নারী আমাকে ঠকাচ্ছে। তার বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে সবকিছুর ব্যয় আমিই বহন করতাম। আর বিভিন্ন উপলক্ষে এটাসেটা কিনে দেওয়া তো আছেই। অথচ কি আশ্চর্য, প্রায়ই সে বলত, আমি যা দেই তাতে তার ঠিক পোষায় না। তার আরো টাকা চাই। আমি বুঝিয়ে বলি, আমার আয়েরও তো একটা সীমা আছে। তুমিও যদি একটা ছোটোখাটো কাজে লেগে যাও তাহলে হয়ত সমস্যা মিটে যাবে। কিসের কি? সে তার মতো করেই চলতে থাকে। প্রায়ই ওর কাছে নানা ধরনের দামি জিনিসপত্র দেখি। প্রথমে আমি কিছু বলিনি। মন বিষণ্ণ হতো, নানা সন্দেহ উঁকি দিত। কিন্তু আমি মনে হয় ওকে ভালোও বেসে ফেলেছিলাম। তাই কিছু বলতাম না। একদিন মন মেজাজ এমনিই খারাপ ছিল। ওর আচরণেও কষ্ট পেয়ে সাফ বলে দিলাম, অনেক হয়েছে আর না। তোমার সঙ্গে আমার সব সম্পর্ক শেষ। এখন থেকে যে যার রাস্তা দেখব। আরো বলে দিলাম, আমার মতো করে কেউ তাকে দেখবে না। একদিন আমার জন্য তার অনুতাপ করতে হবে। তবে এসব বলার আগে, তাকে হালকা মেরেছি। ওকে বাসা থেকে বেরও করে দিয়েছি। কিন্তু মনে হচ্ছে, ওকে ঠিক মতো শাস্তি দিতে পারিনি। যদিও ওর ওপর একটা মায়া জন্মে গেছে। তবু আরো কঠোর শাস্তি ওকে দিতে চাই, যেন আর কারো সঙ্গে এমন আচরণ করার কথা ভাবতেও না পারে। এ জন্যই তোমার পরামর্শ চাই। প্রথমে ভেবেছিলাম, কোনো এক হোটেলে ওকে ডেকে নিয়ে পুলিশে খবর দিয়ে বলবো, একটা সাধারণ বেশ্যা হিসেবে ওর নাম তালিকাভুক্ত করে নিতে। এতেই ওর যথেষ্ট শিক্ষা হবে। বেশ কয়েকজন দাগি মানুষের পরামর্শও চেয়েছি। আশ্চর্যের ব্যাপার, তারা কেউ কোনো উপায় বলতে পারল না। আরে শালা, একটা ছিনাল মাগিকে যদি শায়েস্তা করার কোনো হিম্মতই না থাকে তাহলে আর দাগি-অপরাধী হলি কি করতে? এখন বল, কেমন মনে হল আমার কাহিনি?

ম্যরসল : মনে হওয়ার কিছু নেই। অবশ্য আগ্রহ হয়েছে শুনতে।

 

রেমন্ড : তোমার কি মনে হয়, মেয়েটা আমার সঙ্গে সত্যিই প্রতারণা করেছে?

 

ম্যরসল : আমার তো ওরকমই মনে হয়েছে।

 

রেমন্ড : তবে তো তাকে নিশ্চিতভাবেই শায়েস্তা করা দরকার। কি বল তুমি?

 

ম্যরসল : দরকার কি না, সে বিষয়ে আমি যাব না। তবে তুমি তাকে শায়েস্তা করতে চাও এ বিষয়টি বুঝতে পারছি।

 

রেমন্ড : শোনো, ওকে ভীষণ কড়া ভাষায় একটি চিঠি লিখতে চাই আমি। চিঠিটি এমন হবে, যেন পড়লেই ও ভেতরে ভেতরে জ্বলে-পুড়ে যায়। আবার তাতে তার অনুশোচনাও জাগতে হবে। যেন সে আমার কাছে ফিরে আসে। আর ফিরে আসার পর ওকে ঘরেও জায়গা দেব। তারপর আমার প্রেমে যখন কাতর হয়ে উঠবে তখন ওকে ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দেব।

 

ম্যরসল : এই পরিকল্পনাটা খারাপ নয়। এতে ওকে যথেষ্ট জব্দ করা যাবে।

 

রেমন্ড : হুম। কিন্তু আমি তো জানিনা, মেয়েদের মনগলানো চিঠির ধরন কেমন হয়। এ জন্যই তোমার শরণ নিয়েছি। কি পারবে না এমন একটা পত্র লিখতে?

 

ম্যরসল : পারব কি না জানি না, তবে লিখে দেখতে পারি হয় কি না।

 

রেমন্ড : এই নাও কাগজ-কলম।

 

ম্যরসল : এই নাও। কিছু হয়েছে কি না পড়ে দেখ।

 

রেমন্ড : হয়েছে মানে? খুব ভালো হয়েছে। ঠিক এমনটিই চেয়েছিলাম। আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম, তোমাকে দিয়েই হবে। বন্ধু আমার সবকিছু ঠিক ঠিক বুঝতে পারে। তবে এখন থেকে আমরা বন্ধু!

 

বন্ধু কিংবা বন্ধুহীনতার কোনো পার্থক্য নেই আমার কাছে। সবই এক। কিন্তু রেমন্ডের প্রত্যাশা উন্মুখ মুখের সামনে প্রত্যাখ্যানের বাষ্প ছড়িয়ে দিতে ঠিক ইচ্ছে হলো না।

 

ম্যরসল : হুম, বন্ধু! অনেক রাত হয়ে গেছে। আজ উঠি।

 

রেমন্ড : সময়টা আজ কোন দিক দিয়ে যে চলে গেল, টেরই পাইনি। তোমাকে যেমন বুঝেছি, কোনোকিছুতে ভেঙে পড়ার মানুষ তুমি নও। তোমার মার মারা যাওয়ার খবর আমি জানি। তবে কি, একদিন তো এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেই হতো। এই শোক তো অনিবার্য!

 

ম্যরসল : অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।

 

সালামানো, রেমন্ড ও তার মেয়েবন্ধুর বিত-া এবং পুলিশের মোকাবিলা

 

এর মধ্যে একটা সপ্তাহ কেটে গেল। কিন্তু কোন দিক দিয়ে যে গেল টেরই পাইনি। অবশ্য কাজের বেশ চাপও ছিল। এরই মধ্যে একদিন পথে রেমন্ডের সঙ্গে দেখাও হয়েছিল। সে সানন্দে জানিয়েছে, চিঠি পাঠানো হয়েছে। কাল থেকে আবারও দুদিনের ছুটি। রাতটা ঘুমে পার করে দেই। সকালে মারি এসে আমাকে তোলে। আজ সে নিজের হাতে রান্না করবে বলে আমাকে ব্যাগ হাতে পাঠিয়ে দেয় বাজারে। ফেরার পথে শুনতে পাই, সালামানো যথানিয়মে তার কুকুরটাকে বকছে। আর রেমন্ডের ঘর থেকে এক নারীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। আমি হাসি। ফ্ল্যাটে ঢুকতেই মারি গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে কণ্ঠে কথা বলে ওঠে।

 

মারি : একটা প্রশ্ন করি?

 

ম্যরসল : আমাকে ভালোবাস?

 

ম্যরসল : এ ধরনের প্রশ্ন আমার কাছে কোনো অর্থ বহন করে না। কোনো মানেও নেই। সত্যিই নেই। তবে মনে হয় বাসি না।

 

আর ঠিক সে সময় রেমন্ডের ঘর থেকে উত্তেজিত কথাবার্তার শব্দ ভেসে আসে। সেইসঙ্গে কাউকে মারধরের আওয়াজ। একটি মেয়েলি তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বরের আর্তচিৎকারও ভেসে আসে।

 

রেমন্ড : বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক, মাগি। আমার সঙ্গে ছেনালপনার মজা দেখাচ্ছি তোকে।

 

মারি : কি কা- দেখ। পুলিশে খবর দাও।

 

ম্যরসল : পুলিশের ঝামেলা ভালো লাগে না আমার।

 

কিন্তু আমার খবর দেয়ার অপেক্ষায় থাকেনি পুলিশ। অন্য এক ভাড়াটেই ডেকে নিয়ে এসেছে। পুলিশ এসে দরজায় ধাক্কা দিতেই ভেতরের গোলমাল থেমে যায়। কিন্তু মেয়েটার কান্না শোনা যায়। রেমন্ড এসে দরজা খুলে দিল। তার ঠোঁটে সিগারেট।

 

পুলিশ : নাম কী?

 

রেমন্ড : রেমন্ড।

 

পুলিশ : সিগারেটটা নামিয়ে কথা বললে ভালো হয়। কি ব্যাপার আমার কথা কানে যায়নি?

 

(একটি চড় কষায় পুলিশ আর সিগারেটটা দূরে ছিটকে পড়ে।)

 

রেমন্ড : আমি কি সিগারেটটা নিতে পারি?

 

পুলিশ : নাও, এ ধরনের ঔদ্ধত্য আর কখনো দেখাবে না। এসব আমাদের সঙ্গে চলবে না।

 

মেয়ে : (কেঁদে কেঁদে) ওই শয়তান জল্লাদটা আমাকে মেরেছে। ও একটা ইতর।

 

রেমন্ড : ক্ষমা করবেন। আপনারা শুনলেন তো, ও আমাকে প্রকাশ্যে গালাগাল করেছে। অন্যায় নয় এটা? (মেয়েটার দিকে তাকিয়ে) ঠিক আছে ময়নাপাখি, অন্য কোনো সময় তোমার সঙ্গে দেখা হবে।

 

পুলিশ : যথেষ্ট হয়েছে। (মেয়েটাকে) আপনি এক্ষুনি চলে যান এখান থেকে। আর এই যে হিরো, ঘরটি থেকে যেন একপাও কোথাও বাড়িয়ো না। থানা থেকে খবর না পাওয়া পর্যন্ত ঘরেই থাকবে। একটু লজ্জাও নেই। এত নেশা করেছ, হাত-পা সব কাঁপছে একযোগে।

 

রেমন্ড : আমি নেশা-টেশা করিনি। আপনি আছেন বলেই কাঁপছে সবকিছু।

 

পুলিশ চলে যায়। তার অন্তর্ধানের সঙ্গে উৎসুক মানুষেরাও বিদায় নেয়। রেমন্ড মাথা নিচু করে আমার ফ্ল্যাটে এসে ঢোকে।

 

ম্যরসল : কি হলো এটা?

 

রেমন্ড : সবকিছু পরিকল্পনা মতোই হচ্ছিল। হঠাৎ ও আমাকে মেরে বসে। আর তাতেই সব ওলোট-পালট হয়ে যায়। আমিও আচ্ছামতো ধোলাই দিতে থাকি। আর বাদবাকি সব তো দেখেছই।

 

ম্যরসল : যথেষ্ট শিক্ষা ও পেয়েছে। তুমি যেমন চেয়েছিলে তেমনই হয়েছে। এখানেই সব শেষ। ঠিক আছে?

 

দুপুরে রেমন্ড আমাদের সঙ্গেই খাওয়া-দাওয়া সারে। মারির রান্নার হাত ভালোই। রেমন্ড অনেক প্রশংসা করে। মারি খুশি হয়। সন্ধ্যা হয়ে আসে। বাসায় ফিরবে মারি। তাকে এগিয়ে দিতে যাওয়ার সময় রেমন্ডও সঙ্গী হয় আমাদের। বাড়ির নীচেই দেখা হয় সালামানোর সঙ্গে।

 

কুকুর হারিয়ে বিধ্বস্ত সালামানো

 

ম্যরসল : হয়েছে কি? কোনো সমস্যা?

 

সালামানো : ওই কুত্তা, একটা টোটাল বদমাশ। আমাকে ছেড়ে পালিয়েছে। ব্যাটাকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। আজ কি জন্য যেন ভিড়। ওই সুযোগ নিয়ে আমার হাত ফস্কে ভেগেছে ওটা।

 

রেমন্ড : কুকুর তো। মনিবকে রেখে বেশিদূর যাবে না। দেখবেন পথ চিনে চিনে ঠিকই বাড়ি ফিরে আসবে। ওরকম তো কত কুকুরই হারিয়ে গিয়ে আবার ফিরেও এসেছে।

 

সালামানো : না না। ঠিক বুঝতে পারছেন না। পুলিশ ওকে মেরে ফেলবে। ওই ছাল ওঠা বুড্ডা কুকুর তো আর কেউ বাড়ি নিয়ে পুষবে না।

 

ম্যরসল : থানায় গিয়ে খোঁজ করুন। নিশ্চয় খোঁয়াড়ে নিয়ে আটকে রেখেছে। আপনার কিছু পয়সা গুনতে হবে আর কি। ঠিকই দিয়ে দেবে।

 

সালামানো : আচ্ছা। কত টাকা লাগবে?

 

ম্যরসল : তা অবশ্য ঠিক বলতে পারব না। তবে বেশি লাগবে বলে মনে হয় না।

 

সালামানো : (রেগে) ওই হতচ্ছাড়ার জন্য আমি জরিমানা দেব? কক্ষনো না। মেরে ফেলুক ওটাকে। আমার তাতে কি আসে যায়। (আমরা কিছুদূর এগিয়ে যেতেই সালামানোর চিৎকার) শুনুন। আপনাদের বিরক্ত করছি না তো। ক্ষমা করবেন।

 

ম্যরসল : না ঠিক আছে। বলুন।

 

সালামানো : আমার কাছ থেকে তো ওকে কেউ জোর করে নিয়ে যাবে না। কি বলেন? নিলে আমার খুব বাজে দশা হবে।

 

ম্যরসল : শুনুন। ওখানে মালিকহীন কুকুর তিনদিন রাখা হয়। এরপর তারা যা করার করে।

 

সালামানো : বাঁচালেন। একটু বোধ হয় নিশ্চিন্ত হতে পারলাম। যাই তবে। শুভরাত্রি।

 

বসের সঙ্গে কথোপকথন

 

বস : আমরা আপনাকে অন্য একটা বড় শহরের দায়িত্ব দিয়ে পাঠাতে চাই। আপনার যেতে কোনো আপত্তি নেই তো? শহরটা সুন্দর। আপনার ভালো লাগবে বলেই আমার বিশ্বাস।

 

ম্যরসল : আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি তৈরি।

 

বস : একটু চেঞ্জ। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ। এই পরিবর্তন আপনার খারাপ লাগবে না।

 

ম্যরসল : জীবনের কি কোনো পরিবর্তন হয়? পরিবর্তন হয় যাপনের পদ্ধতির। এছাড়া সবই এক। আমি এখানেও ভালোই আছি।

 

বস : আপনার সবকিছুতেই একটা, কি বলব, মানে এলানো, গা ছাড়া একটা ভাব আছে। ওপরে ওঠার স্বপ্ন না দেখাটা মহান চিন্তা হয়ত কিন্তু জানেন তো ব্যবসার জন্য তা বিশেষ সুবিধের কিছু নয়।

 

মারির বিয়ের প্রস্তাব

 

ওইদিন বিকালে মারি এল আমার ফ্ল্যাটে। কিছুক্ষণ থাকার পর হুট করেই জিজ্ঞেস করল-

 

মারি : বিয়ে করবে আমাকে?

 

ম্যরসল : কোনো আপত্তি নেই আমার। তুমি যদি আগ্রহ বোধ করো তবে করে ফেলব।

 

মারি : আমাকে কি ভালোবাসো?

 

ম্যরসল : এ প্রশ্নের কোনো মানে বহন করে না আমার কাছে। তবে তোমায় মনে হয় ভালোবাসি না।

 

মারি : যদি তাই মনে হয়, তো আর বিয়ে করবে কেন?

 

ম্যরসল : শোনো, ওই বিষয়টার কোনো অর্থ আমার কাছে নেই। তুমি যদি আনন্দিত হও, খুশি হও তবে এই মুহূর্তেই বিয়েটা সেরে ফেলতে পারি। আর প্রস্তাবটা কিন্তু তোমার দিক থেকেই এসেছে। আমি গ্রহণ করেছি মাত্র।

 

মারি : বিয়ে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়।

 

ম্যরসল : একটুও না।

 

মারি : আচ্ছা, অন্য কোনো মেয়ে যদি তোমায় বিয়ে করতে বলত, এই ধরো আমায় যেমন পছন্দ করো ওমন পছন্দসই কেউ যদি বলত তবে কি তুমি সম্মত হতে?

 

ম্যরসল : নিশ্চয়, হতাম বই কি।

 

মারি : ওহ, আমার নিজেকে বিভ্রান্ত লাগছে। আমার সন্দেহ হচ্ছে, তোমাকে ঠিক ভালবাসি কি না?

 

ম্যরসল : মাফ করো। এই বিষয়টিতে তোমায় কোনোভাবেই সহায়তা করতে পারছি না।

 

মারি : (বিরতি) তুমি ভীষণ অদ্ভুত এক মানুষ। সম্ভবত এ কারণেই তোমাকে পছন্দ করি, ভালোবাসি। আর এ জন্যই হয়ত প্রচ- ঘৃণাও করব একদিন।

 

(বিরতি। কিছুক্ষণ পর হাসতে হাসতে) কিন্তু এটা ভীষণ সত্যি যে, বিয়ে করতে চাই তোমাকে।

 

ম্যরসল : সমস্যা নেই তো। যখনই বলবে ঠিক তখনই বর সেজে তোমার সামনে হাজির হবো। শোনো, অফিস থেকে আমাকে অন্য শহরে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। আমি বলে দিয়েছি, আপত্তি নেই। তোমার কি মত?

 

মারি : তোমার সঙ্গে সবখানেই আমার ভালো লাগবে।

 

মারি চলে যায়। আমি বসে আছি জানালার ধারটাতে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোতে একে একে জ্বলে উঠেছে বাতি। গাড়ি চলে যাচ্ছে একের পর এক হুসহাস করে। অনির্দিষ্ট কোনো ভাবনার ঘোরে ডুবে ছিলাম। সেই ঘোর কাটে সালামানোর প্রবেশে।

 

কুকুরের জন্য সালামানোর শোক

 

সালামানো : আমার কুকুরটা হারিয়েই গেছে। থানায় গিয়েছিলাম। কিন্তু ওখানকার খোঁয়াড়ে পাইনি। সবাই বলাবলি করছে, ওটা হয়ত গাড়িচাপা পড়েই মরেছে।

 

ম্যরসল : এক কাজ করুন। আরেকটা কুকুর এনে পোষা শুরু করুন।

 

সালামানো : এই কুকুরটা আমার দীর্ঘদিনের সঙ্গী ছিল। অন্য কোনো কুকুরের সঙ্গে আর সেরকম কিছু হবে না। মানে ভালো লাগবে না।

 

ম্যরসল : ওটা আপনার সঙ্গে কতদিন ধরে ছিল?

 

সালামানো : সেই যে স্ত্রী মারা গেল, তারপর থেকেই ওটাই ছিল আমার সঙ্গী। স্ত্রীর সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক ছিল না আমার। আমরা দুজন দুজনকে কোনোরকমে সয়ে গেছি। কিন্তু তারপরও ও মারা যাওয়ার পর কুকুরটাকে এনেছিলাম। সেই বাচ্চা বয়স থেকে ওটাকে লালনপালন করেছি। ওটাকে যখন নিয়ে আসি তখন ফিডারে দুধ খাওয়াতে হতো। কুকুরের তো তেমন আয়ু থাকে না। আমি আর ওটা দেখতে দেখতে একসঙ্গে বুড়ো হয়েছি। ওটার বাজে দিক ছিল, খুব বদরাগী। মাঝেমধ্যেই আমার সঙ্গে বেধে যেত। অবশ্য একেবারেই কোনো গুণও যে ছিল না তা নয়।

 

ম্যরসল : ওটা ভালো জাতের ছিল মনে হয়।

 

সালামানো : অসুখে পরার আগে কি যে সুন্দর ছিল ওটা দেখতে। এত্তো বড় বড় লম্বা লোম আর খুব আদুরে চেহারা ছিল। কিন্তু অসুখের পরই কেমন যেন হয়ে গেল। গায়ের লোম সব পড়ে গেল, চামড়াতেও কি যেন হয়েছিল। তারপরও সারাবার জন্য ওটার গয়ে অনেক ওষুধ মাখিয়েছি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। আসলে বুড়ো হয়ে গিয়েছিল তো, তাই ওষুধ আর কাজ করেনি।

 

ম্যরসল : কুকুরটি হারিয়ে আপনার অনেক বড় ক্ষতি হলো।

 

সালামানো : জানেন আপনার মাও না কুকুরটা ভীষণ পছন্দ করতেন। দুঃখিত। নিশ্চয় মায়ের জন্য এখনও আপনার মনটা বিষণ্ণ হয়ে আছে।

 

ম্যরসল : না না, কোনো সমস্যা নেই। আমি ঠিকই আছি।

 

সালামানো : আমি উপলব্ধি করতে পারি। আপনি বোধ হয় জানেন না, আশপাশের অনেক মানুষ আপনার মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর জন্য ঠিক ভালো চোখে দেখে না। নানা ধরনের কথা বলে। তবে আমি তো জানি, মাকে আপনি কী ভীষণ ভালোবাসতেন।

 

ম্যরসল : প্রতিবেশীদের এত বিরূপ ধারণা আমার নিয়ে? খুব আশ্চর্য লাগছে। অথচ মাকে ভালোভাবে রাখার মতো সামর্থ্য যদি আমার না থাকে তবে আশ্রমে রেখে আসা ছাড়া কি-ইবা করার ছিল আমার। এখানে তিনি অনেকগুলো বছল কষ্ট সহ্য করেছেন। তাকে সঙ্গ দেওয়ার মতো, কথা বলার মতো কোনো মানুষ ছিল না। এখানে যে তার খুব ভালো লাগছিল এমন তো নয়। কিন্তু ছেলের অবস্থা দেখে মেনে নিয়েছিলেন হয়ত।

 

সালামানো : সে তো ঠিকই। আশ্রমে যাই হোক না কেন, সমবয়সী মানুষ পাওয়া যায়, কথা বলার সঙ্গী জোটে। আমি তাহলে এখন যাই। কুকুরটাকে হারিয়ে অসহায় লাগছে। সময় কাটানো আমার জন্য এখন কষ্টেরই হবে। জানেন, কয়েকদিন ধরে, রাতে কোনো কুকুরের ডাক শুনলেই কান খাড়া করি, মনে হয় ওই হতচ্ছাড়াটাই বোধ হয় ডাকছে।

 

একটি খুনের গল্প

 

আমার নিস্তরঙ্গ জীবনে একটি ঘটনাই সবকিছু কেমন ওলট-পালট করে দেয়। তার জন্য কোনো প্রস্তুতি ছিল না আমার। থাকার কথাও নও। জীবনপিয়াসী কেউ কি দূরবর্তী মৃত্যুকে হুট করেই সামনে টেনে আনে? সেদিন ছিল আমার সাপ্তাহিক ছুটি। সকালে মারি এসে ঘুম থেকে তোলার কিছুক্ষণ পর রেমন্ডও এসে হাজির। সে প্রস্তাব দিল, সৈকতে তার এক বন্ধুর বাংলো আছে। সেখানে যেতে পারি। সমুদ্রস্নানও হবে আবার নতুন একটি পরিবারের সঙ্গেও আলাপচারিতা হবে। ভেবে দেখি, মন্দ হয় না। আমরা সৈকতের উদ্দেশে যাত্রা শুরুর পর রেমন্ড কিছুটা আশঙ্কার স্বরে আমায় জানাল, কয়েকজন পিছু নিয়েছে তার। আমি তাকে আশ্বস্ত করি। কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা কিছু যেন খচখচ করতে থাকে। এরই মাঝে রেমন্ডের বন্ধুর বাংলোয় চলে আসি। বেশ অমায়িক দম্পতি, হাসি-খুশি। আমাদের গ্রহণ করল উষ্ণতার সাথেই। মারি রেমন্ডের বন্ধুদম্পতির সঙ্গেই আড্ডায় মেতে ওঠে। ওখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমি আর রেমন্ড বের হলাম সৈকতে হাঁটব বলে। কিছুদূর আসার পর টের পাই ওই লোকগুলো একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। ভয়কে প্রশ্রয় দিলেই সেটি আরো জেঁকে বসে। এই কথা বলে রেমন্ড সোজা লোকগুলোর দিকে এগিয়ে যায়। আমি সতর্ক করি। কিন্তু কে শোনে কার কথা। কাছাকাছি যেতেই একটি লোকের হাতে কি যেন ঝিঁকিয়ে ওঠে। ছুরি। লোকটি সোজা বসিয়ে দিয়েছে রেমন্ডের মুখে। আর্তচিৎকার শুনে আমি দৌঁড়ে যাই। অপর লোকটিও ছুরি বের করলেও তারা দুজনেই খোলা ছুরি হাতে পিছিয়ে যায়। রেমন্ডকে ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। কয়েকটা সেলাই লেগেছে। ডাক্তারের ওখান থেকে বেরিয়ে বাংলোর দিকে যেতে চাইলে রেমন্ড আবার সৈকতেই হাঁটতে চায়। আমিও তার সঙ্গী হই। কিছুদূর যাওয়ার পর সেই লোক দুটোকে দেখলাম ভাবলেশহীন শুয়ে আছে। রেমন্ড তার পকেটে থাকা পিস্তলে দেয় হাত।

 

রেমন্ড : গুলি মেরে দেব নাকি বদের হাড্ডিটাকে।

 

ম্যরসল : যা হবার হয়ে গেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে ও তোমাকে কিছু বলেনি। আর বিনা উসকানিতে গুলি চালানো ভিতু মানুষের কাজ হবে।

 

রেমন্ড : আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার যদি এমনই মনে হয়, তবে ওই শুয়োর দুটোকে একটু গালিগালাজ করি। জবাব দেয়া মাত্র আর দেরি করব না। ঠুস করে দেব।

 

ম্যরসল : আচ্ছা, সেটা হতে পারে। কিন্তু ও যদি ছুরি নিয়ে তোমায় আক্রমণ করতে না আসে, সেক্ষেত্রে বোধ হয় তোমার গুলি করা ঠিক হবে না। শোনো পিস্তলটা আমার কাছে রাখ। যে লোকটা তোমায় মেরেছে তার দিকে নজর দাও তুমি। অন্যলোকটা কিছু করলে আমি সামলাব। যদি ছুরি বা অন্যকিছু বের করতে চায় ঠিক আমি গুলি চালিয়ে দেব।

 

ওই মুহূর্তে মনে হলো, গুলি করা অথবা না করা একই কথা। অবাক কা- লোকগুলো অকস্মাৎ চোখের পলকে ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে গেল। আমরা দুজন ফিরে আসি বাংলোয়। রেমন্ড ভেতরে চলে যায়। কিন্তু আমি আবার ফিরে আসি সমুদ্রতীরে। কি জানি, কেনই বা আমি এই প্রচ- রোদের মধ্যে বেরিয়ে এলাম। হাঁটতে শুরু করলাম। কিছুদূর যাবার পর চোখে পড়ে, ওই দুটো লোক আবার ফিরে এসেছে। আমি চমকে উঠি। আমার কাছে বিষয়টি তার তেমন গুরুতর মনে হয়নি। ভেবেছিলাম, যা হবার হয়ে গেছে। সব চুকেবুকে গেছে। কিন্তু একটু ছায়ার খোঁজে এগিয়ে যেতেই একটি লোক ছুরি বের করে আমায় আঘাত করে বসে। প্যান্টের পকেটে রেমন্ডের পিস্তল। তাতে আমার হাত। কখন যে ট্রিগারে চাপ লেগে গেছে ঠিকমতো টেরও পাইনি। লোকটি পড়ে যায়, আর অপর লোকটি দৌঁড়ে পালায়। আঘাতটি লেগেছিল হাতে। বেশ জ্বালা করে ওঠে। প্রচ- রোদের মাঝে কেমন ঘোরগ্রস্ত মনে হয় নিজেকে। আর তারই আবেশে সামনে পড়ে থাকা মৃতদেহটির ওপর কখন আর কেনইবা একনাগাড়ে কয়েকটি গুলি করে বসি আমি টেরও পাইনি। তবে বুঝতে পারছিলাম, বিনাশ আমার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে অট্টহাসি দিচ্ছে।

 

উকিলের সঙ্গে কথোপকথন

 

খুনের দায়ে আমাকে গ্রেফতার করা হয়। নিয়ে যাওয়া হয় কারাগারে। আমার বিরুদ্ধে দায়ের হয় মামলা। কিন্তু এই মামলায় লড়বার জন্য আমি কাউকে নিয়োগ করিনি। ফলে সরকারই আমার জন্য একজন উকিল নিয়োগ করে।

 

উকিল : আপনার মামলার পুরো বিবরণ আমি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে সামলানো দরকার। আমার কথা অনুযায়ী চললে আপনার ছাড়া পেতে কঠিন হবে না।

 

ম্যরসল : ধন্যবাদ। মামলাটা আমার কাছে সহজই মনে হয়। যে কারণে নিজে উদ্যোগী হয়ে উকিল নিয়োগ করিনি।

 

উকিল : (হাসি) আপনার কাছে সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু সবকিছু তো আইন অনুযায়ী হতে হবে। আর কোনো আসামি উকিল নিয়োগ না করলে রাষ্ট্রই সে ব্যবস্থা করে। যে কারণে আমি এখন আপনার সামনে।

 

ম্যরসল : সরকারের এ ব্যবস্থা আমার পছন্দ হয়েছে।

 

উকিল : ধন্যবাদ। এবার আসুন আমরা মূল কাজে আসি। আপনার মা সম্প্রতি বৃদ্ধাশ্রমে মারা গেছেন। বিষয়টি আমরা জানি। সেখানে পুলিশ গিয়েছিল। তারা জানতে পেরেছে, ওখানে আপনি খুব নির্বিকার ছিলেন। মানে শেষকৃত্যানুষ্ঠানে আপনার কোনো ভাবান্তর ছিল না। এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে আমার অস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু এই মামলায় আপনার ওই বিষয়টি বেশ গুরুতর প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। সেটা যদি এড়ানো না যায় তবে মামলাটা লড়তে বেশ কঠিন হবে। তবে আপনিই শুধু এ ক্ষেত্রে আমাকে সহায়তা করতে পারেন।

 

ম্যরসল : কীভাবে?

 

উকিল : আপনি শুধু বলবেন মায়ের মৃত্যুতে আপনি এতটাই কাতর হয়ে পড়েছিলেন কোথা দিয়ে কি হচ্ছে ঠিক বুঝতেই পারেন নি। কিন্তু বাইরে সেটা প্রকাশ পাক সেটি আপনি চাননি।

 

ম্যরসল : মায়ের মৃত্যুতে কষ্ট পেয়েছিলাম কি না তাও ভাষায় প্রকাশ করতে হবে প্রমাণ হিসেবে? খুবই অবাক করা ব্যাপার। তবে সত্যি কথা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে কখন কোথায় কি হচ্ছে সে বিষয়টি খুব একটা খেয়াল আমি করি না। আর, সচরাচর প্রায় সব মানুষই কখনো কখনো তাদের প্রিয় মানুষের মৃত্যু যাচনা করে।

 

উকিল : সাবধান, বিচারকের সামনে ভুলেও এ ধরনের কোনো কথা বলবেন না দয়া করে।

 

ম্যরসল : ঠিক আছে, চেষ্টা করব। অবশ্য বিষয়টি আমার শারীরিক সুস্থতা আর মনের অবস্থার ওপর নির্ভর করবে। ও হ্যাঁ, আমার মা বেঁচে থাকলেই বেশি ভালো হতো।

 

উকিল : আমি সন্তুষ্ট নই। আচ্ছা, মায়ের মৃত্যুতে আপনি আপনার কষ্টটুকু লুকিয়ে রেখেছিলেন, এ কথাটুকু বলতে বাধা কোথায়?

 

ম্যরসল : তাতে সত্য বলা হবে না।

 

উকিল : বৃদ্ধাশ্রমের ওয়ার্ডেনসহ আরো কয়েকজনকে সম্ভবত সাক্ষী হিসেবে ডাকা হবে। আর তাতে আপনার বড় ধরনের সমস্যা হয়ে যেতে পারে।

 

ম্যরসল : আমার এই খুনের সঙ্গে মায়ের মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই।

 

উকিল : আইন-আদালত ইত্যাকার বিষয়ে আপনার তেমন কোনো জ্ঞান আছে বলে মনে হয় না।

 

ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে কথোপকথন

 

আমার কথায় উকিল সম্ভবত খুব বেশি খুশি হতে পারেননি। তিনি চলে যান খানিক বিষণ্ণ মনেই। পরদিন আমাকে নিয়ে যাওযা হয় ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। আমার জবানবন্দি নেয়া হবে। সেদিন আমার উকিল আর আসেননি। আর উকিলের অনুপস্থিতিতে আমি কোনো প্রশ্নের জবাব চাইলে নাও দিতে পারি বলে আশ্বস্ত করলেন তিনি। কিন্তু আমি নিজেই নিজের কৃতকর্ম বিষয়ে জবাব দিতে পারব বলাতে তিনি আমার জবানবন্দি গ্রহণ করেন।

 

ম্যাজিস্ট্রেট : অনেকেই মনে করেন আপনি আত্মকেন্দ্রিক একজন মানুষ। চুপচাপ, নিজের মধ্যেই থাকেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য থাকলে বলতে পারেন।

 

ম্যরসল : আসলে, কোথাও আমার নিজের বলার মতো তেমন কিছু আমি পাই না, থাকে না। সে কারণে কিছু বলি না, নিজের মধ্যেই নিশ্চুপ থাকি।

 

ম্যাজিস্ট্রেট : আসলে আপনার নিজের সম্পর্কেই প্রকৃত ঔৎসুক্য কিংবা কৌতূহল, যাই বলি না কেন। তাই না? সে যাকগে। এই খুনের ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আশা করি আপনি আমায় সহযোগিতা করবেন।

 

ম্যরসল : এর মধ্যে কোনো জটিলতা আমি দেখছি না।

 

ম্যাজিস্ট্রেট : বেশ। আচ্ছা মাকে কি ভালোবাসতেন?

 

ম্যরসল : বাসতাম, আর সবার মতোই।

 

ম্যাজিস্ট্রেট : আচ্ছা, এবার একটা বিষয় একটু খোলাসা করুন। আপনি ওই লোকটিকে গুলি করেছিলেন পরপর পাঁচবার। কেন?

 

ম্যরসল : না, পরপর গুলি আমি করিনি।

 

ম্যাজিস্ট্রেট : তো?

 

ম্যরসল : লোকটাকে প্রথম গুলি করার কিছুক্ষণ পর বাকি চারটি গুলি করেছিলাম।

 

ম্যাজিস্ট্রেট : ঠিক আছে। আপনার কথাই মেনে নিচ্ছি। কিন্তু প্রথমবার গুলি করার পর কিছুক্ষণের বিরতি কেন নিলেন?

 

ম্যরসল : কেন করলাম!

 

ম্যাজিস্ট্রেট : হ্যাঁ হ্যাঁ, কেন করলেন। একটি লোক গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ার পরও চারটি গুলি করলেন পরপর। কেন?

 

ম্যরসল : আসলে সমুদ্রের বালি রৌদ্রের তাপে ভীষণ উত্তপ্ত ছিল, বাতাসেও যেনবা ছিল আগুনের হলকা। মনে হচ্ছিল যেন আমার মুখ-শরীর পুড়ে যাচ্ছে। মানে…

 

ম্যাজিস্ট্রেট : আপনি কি আমার কথা বুঝতে পারছেন? আমি জিজ্ঞেস করেছি, কেন পরপর চারবার গুলি করলেন, কেন কেন? কেন থেমেছিলেন, বলুন, চুপ করে থাকবেন না।

 

ম্যরসল : প্রথমবার গুলি করার পর কেন থেমেছিলাম, তার কারণ জানা এতই জরুরি?

 

ম্যাজিস্ট্রেট : আপনার দেয়া স্বীকারোক্তিতে সম্পূর্ণ ঘটনার একটা মানে পাওয়া যায়। কিন্তু ওই যে থেমে ছিলেন, শুধু ওইটুকুই আমার কাছে বোধগম্য নয়। আচ্ছা, ঈশ্বর মানেন তো।

 

ম্যরসল : তেমন করে ভেবে দেখার অবকাশ পাইনি।

 

ম্যাজিস্ট্রেট : ঈশ্বরহীন জীবনের কোন অর্থই থাকে না। বিরুদ্ধাচরণ করলেও প্রত্যেকেই তাঁকে কোন না কোনো সময় মান্য করে।

 

ম্যরসল : হবে হয়ত। তবে সবকিছু তাঁর হাতে সঁপে দিলে এসবের আর কী প্রয়োজন?

 

ম্যাজিস্ট্রেট : আমি আমার এই বয়স পর্যন্ত এতো নিলিপ্ত মানুষ কখনো দেখিনি। সব অপরাধীই ঈশ্বরের কথা ওঠায় অনুতপ্ত হয়েছে, কেঁদেছে, ক্ষমা ভিক্ষা করেছে।

 

ম্যরসল : তারা অপরাধী ছিল বলেই অনুতপ্ত হয়েছে, কেঁদেছে…

 

ম্যাজিস্ট্রেট : আচ্ছা… যাকগে। যে অপরাধ আপনি করেছেন, তার জন্য অনুতাপ নেই আপনার?

 

ম্যরসল : অনুতাপের চেয়ে নিজের ওপর ভীষণ বিরক্ত লাগছে।

 

ম্যরসলের বিচার ও দন্ড

 

আমার জবানবন্দি গ্রহণের কিছুদিন পর চূড়ান্ত বিচার শুরু হয়। বিচারক আসেন, আমি কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়াই, নিজের পরিচয় জানাই এবং সত্যবলার শপথবাক্য পাঠ করি। আর একে একে এই মামলায় আমার বিরুদ্ধে এবং পক্ষের সাক্ষীদের ডাকা হতে থাকে। সরকারি উকিল এবং আমার উকিল তাদের জেরা করে চলেন। মাঝে মাঝে বিচারকও কথা বলেন। এইভাবেই একদিন বিচারের সব প্রক্রিয়া শেষে আমাকে দন্ডিত করা হয়।

বিচারক : আপাতভাবে দেখলে কয়েকটি বিষয় অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। তবুও এ বিষয়গুলোর সুরাহা হওয়া প্রয়োজন কেননা আদালতের বিবেচনায় এগুলো দরকারি। আপনি আমার কথা বুঝতে পেরেছেন?

 

ম্যরসল : জ্বী।

 

বিচারক : মাকে বৃদ্ধাশ্রমে কেন পাঠিয়েছিলেন?

 

ম্যরসল : এটি বোঝা খুব সহজই হওয়ার কথা। কারণ আমি তাঁর যথাযথ যত্ন নিতে পারছিলাম না, সেই সামর্থ্য আমার ছিল না।

 

বিচারক : মাকে আশ্রমে পাঠিয়ে দেয়ার পর কষ্ট হয়েছিল?

 

ম্যরসল : আসলে আমি এবং আমার মা কেউই কারো কাছে কোনোকিছু প্রত্যাশা করতাম না। এ কারণে আমরা দুজনেই চলমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলাম।

 

বিচারক : আমার আর এ বিষয়ে তেমন কিছু জানবার নেই। সরকারপক্ষের আইনজীবী চাইলে প্রশ্ন করতে পারেন।

 

সরকারি উকিল : সমুদ্রসৈকতে আপনি কি ওই লোকটিকে খুন করার উদ্দেশ্যেই গিয়েছিলেন?

 

ম্যরসল : না, সে ধরনের কোনো ইচ্ছা বা পরিকল্পনা আমার ছিল না।

 

সরকারি উকিল : তাহলে সঙ্গে রিভলভার নিয়ে গিয়েছিলেন কেন? আর যেখানে লোকগুলো ছিল সেখানেই বা গিয়ে হাজির হলেন কেন?

 

ম্যরসল : এটা নিছক মিরাকল।

 

সরকারি উকিল : তাই!

 

সরকারি উকিল : আচ্ছা, আসামির মা কি সন্তানের ব্যবহার নিয়ে কোনো রাগ-অভিযোগ করতেন?

 

ওয়ার্ডেন : সেটা করতেন। তবে ও এমন কিছু নয়। ওখানে যারাই থাকেন তাদের প্রত্যেকেরই স্বজনদের প্রতি ওই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।

 

সরকারি উকিল : আচ্ছা, মায়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের সময় আসামির অবস্থা, মানে তার আচরণ সম্পর্কে কিছু বলুন।

 

ওয়ার্ডেন : আমি তার মাঝে তেমন কোনো ভাবান্তর লক্ষ করিনি। মায়ের মৃতদেহও তিনি দেখেননি, এমনকি একটুও কাঁদেননি পর্যন্ত। কফিন কবরস্থ হওয়ার পরপরই তিনি চলে গেছেন, কিছু সময়ের জন্যও থাকেননি। আর আশ্রমের একজন মায়ের বয়স জানতে চাইলে তিনি বলতে পারেননি।

 

বিচারক : ওনাকে আপনি কতদিন ধরে চেনেন?

 

মারি : ওর অফিসে কাজ করার সময় থেকে।

 

বিচারক : আপনার সঙ্গে সম্পর্ক?

 

মারি : আমি ওর বান্ধবী। আমরা বিয়ে করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

 

সরকারি উকিল : আচ্ছা, পরিচয় আগে হলেও আপনারা ঘনিষ্ঠ হয়েছেন বেশ পরে তাই না?

 

মারি : জ্বী।

 

সরকারি উকিল : আপনারা যেদিন ঘনিষ্ঠ হন তার আগের দিন আসামির মায়ের শেষকৃত্য হয়েছে। তাই না?

 

মারি : জ্বী।

 

সরকারি উকিল : ওইদিন আপনারা সিনেমা দেখেছেন, তারপর একসঙ্গে রাত কাটিয়েছেন।

 

মারি : জ্বী।

 

সরকারি উকিল : মায়ের শেষকৃত্যের পরদিনই আসামি এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছে, সিনেমা দেখেছে। বিষয়টি আদালত যেন স্মরণে রাখে।

 

রেমন্ড : ও নির্দোষ।

 

বিচারক : সেটা আদালত নির্ধারণ করবে। আপনি নন। যা প্রশ্ন করা হবে তার উত্তর দেবেন। এর বেশি কিছু করতে যাবেন না। নিহত লোকটির সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?

 

রেমন্ড : আমি তার বোনকে মারধর করেছিলাম। সে কারণে আমার ওপরই ওর রাগ ছিল। আসামি আমার সঙ্গে ওই দিন সমুদ্র সৈকতে গিয়েছিল সেটা জাস্ট মির‌্যাকল।

 

সরকারি উকিল : এই হত্যাকা- বা ঘটনার মূলে যে চিঠি সেটা আসামির লেখা কেন?

 

রেমন্ড : এটাও মির‌্যাকল।

 

সরকারি উকিল : বাহ! সবকিছুই তো তবে মির‌্যাকল দেখা যাচ্ছে। তা আপনি যখন আপনার রক্ষিতাকে মারধর করছিলেন তখন আসামি আপনাকে বাধা দেননি কেন? নাকি সেটাও মিরাকল! আসামি আপনার কে হয়?

 

রেমন্ড : আমার বন্ধু, প্রকৃতবন্ধু।

 

সরকারি উকিল : আপনি কি তা স্বীকার করেন?

 

ম্যরসল : হ্যাঁ, করি।

 

সরকারি উকিল : মহামান্য আদালত, আসামি শুধু মায়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পরদিন সম্ভোগ আর ফুর্তিতেই লিপ্ত হয়নি, বিনা উসকানিতে ঠান্ডা মাথায় একজন মানুষকে খুনও করেছেন। এখন আপনারাই বিবেচনা করুন কেমন চরিত্রের মানুষ তিনি।

 

উকিল : আচ্ছা, এখানে কিসের বিচার হচ্ছে? খুন নাকি মাকে কবর দেয়ার ব্যাপারে?

 

সরকারি উকিল : আমার সহকর্মী বন্ধু উকিল বোধ হয় বিষয়টি বুঝতে পারেন নি। মায়ের শেষকৃত্যের পরদিনই যে মানুষ ওমন উল্লাসে মেতে উঠতে পারে, তারপক্ষে অমানবিক আর সবকাজই সম্ভব। তারপক্ষেই সম্ভব, একটি নিহত মানুষের ওপর পরপর চারটি গুলি চালানো। মহামান্য আদালত, আসামি একজন শিক্ষিত মানুষ। সম্পূর্ণ স্বজ্ঞানে পরিকল্পিতভাবে তিনি এ হত্যাকা- ঘটিয়েছেন। এ বিষয়ে আর কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। আমি দ্ব্যর্থহীন চিত্তে আসামীর মৃত্যুদ- দাবি করছি।

 

বিচারক : আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত প্রকাশ্যে শির-েদে মৃত্যুদ- কার্যকরের দ- ঘোষণা করছে।

 

ম্যরসলের অন্তিমসময়ের প্রতীকচিত্র

 

খুনের দায়ে ম্যরসলকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। বিচার চলাকালে মানুষের নানা বিচিত্র চিন্তা আর আচরণ তাকে বেশ অবাক করে। সে তখনই শুধু বুঝে উঠতে পারে, মানুষের আচরণকে ব্যাখ্যা করার নানা পদ্ধতি রয়েছে। প্রত্যেকেই নিজের মতো করেই ভাবে। তবে তাতে পারিপার্শ্বিকতা আর প্রচলিত নীতিবোধের প্রভাব থাকে সবচেয়ে বেশি। কজনই বা চেনাপথ ছেড়ে অজানা পথে গন্তব্যে পৌঁছুতে চায়। আর রাষ্ট্রযন্ত্র সেও এক অত্যাশ্চর্য কাঠামো। বিচারে ম্যরসলকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়। কিন্তু কেন? সে কি শুধুমাত্র একটি খুনের জন্যই নাকি অন্য আরো কোনো অনুঘটক সেখানে ক্রিয়াশীল ছিল? এক অনিচ্ছুক খুনের দায়ে দায়ী ম্যরসল। সে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল তা সে যেভাবেই হোক না কেন। সে ছিল জীবনপিয়াসী। কিন্তু আইন-রাষ্ট্রযন্ত্র তাকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। তার কৃতকর্ম আর শেষপরিণতিকে প্রতীকচিত্রে উপস্থাপন করা যেতে পারে এইভাবে।

 

ঐ নগরের অনেক কিছুই আমাদের কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। যদিও এই বিভ্রান্তিই তাদের জন্যে স্বাভাবিক। এই যেমন- ওখানকার বাসিন্দারা সব উল্টো করে হাঁটে। আর তাই কেউ হাঁটলে মনে হতে পারে পিছোচ্ছে। বস্তুতপক্ষে এভাবেই তারা চলাচল করে। ওখানে প্রাথমিক স্কুলের গন্ডি পেরোনোর পর কেউ আর পড়ে না, সবাই পড়ায়। মোটামুটি স্বশিক্ষিত মহাজ্ঞানীদের বসবাস ধরা চলে। ওখানকার পত্রপত্রিকা আর বইয়ে যা লেখা থাকে তা পড়ে উল্টোটাই সঠিক ধরতে হয়। যেমন- কোনো পত্রিকায় খবর বেরুলো ‘সকল কিছু মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে’ নিশ্চিত ধরে নিতে হবে পণ্যের এমন মূল্যবৃদ্ধি কেউ কখনো দেখেনি আগে। কিংবা অমুককে এবার এবার সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘নগর উন্নয়ন পদক’র জন্য মনোনীত করা হয়েছে।’ তাহলে ধরে নিতে হবে তার মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর হতে আর দেরি নেই। অথবা নগর প্রশাসনের কোনো গ্রন্থে লেখা আছে- ‘এ নগর পত্তন করেছেন তিনি।’ ধরে নিতে হবে নগরের জন্মে তিনিই সবচেয়ে’ বেশি বিরোধিতা করেছেন। যদি সংবাদ ওঠে ‘নগর প্রশাসক পরপর সাত বার ওনেস্টি পুরস্কার জয় করেছেন।’ নিশ্চিত থাকা যেতে পারে তারচেয়ে’ বড় দুর্নীতিবাজ আর কেউ নয়। এই হলো মোটামুটি ঐ নগরের অবস্থা। তবে দূরবর্তী নৈর্ব্যক্তিক অবস্থান থেকে বিষয়গুলো আমরা যেভাবে উপলব্ধি করতে পারছি, ওখানকার বাসিন্দারা তা পারে না, তাদের কাছে এসবই সভ্যতার ধারাবাহিকতার অংশমাত্র। আর তাই এই উল্টোরথও তাদের কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হয় না। হবেই বা কী করে, নগরের প্রশাসন আর মিডিয়া এমনভাবে গোয়েবলস থিউরি মেনে চলে, যে কোনো বিভ্রান্তি কিংবা দিবালোকের মতো সত্যকেও তারা বারবার উল্টো করে প্রচার করায় সেই ডাহা মিথ্যেটাও একসময় সত্যে আর চূড়ান্ত সত্যটাও রূপান্তরিত হয় ঘৃণ্য মিথ্যায়। ওখানকার বিচারালয়গুলোতে বিচারকগণ চোখে কালো কাপড় পরে বসেন। কেননা আইন অন্ধ, তবে সবার জন্য সমান কিনা এ বিষয় নিয়ে সেখানকার কারো কোনো প্রশ্ন নেই, অবশ্য সবার জন্য সমান অর্থাৎ সাম্য বিষয়টি তাদের বোঝার প্রয়োজন হয় না। কেননা, ওখানে কারো বিচার শুরু হলে, নগর প্রশাসন থেকে শুরু করে মিডিয়াগুলো আগেভাগেই যেভাবে তার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পরিবেশন করা শুরু করে, তাতে করে বিচারকের তেমন কোনো কষ্টই করতে হয় না, তিনি চোখে কালো পট্টিবাঁধা অবস্থাতেই সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়ে দিতে পারেন অনায়াসে।

 

মোট কথা আমরা যারা এখন এ সময়ে বসবাস করছি, ঐ নগরে গেলে নিশ্চিতভাবেই আমাদের পাগল সাব্যস্ত করা হবে। আজব চিড়িয়া হিসেবে চিড়িয়াখানায় পাঠালেও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।

 

ঐ নগরের পাশ ঘেঁষে এক সুড়ঙ্গ চলে গেছে কোথায় কে জানে! কেউ বলে, এই সুড়ঙ্গ চলে গেছে পৃথিবীর শেষপ্রান্তে। আবার কেউ বলে এই পথ দিয়েই ভবিষ্যতে চলে যাওয়া যায়। এই দু’টো মতবাদকে উল্টে নিলে দাঁড়াচ্ছে, নগরটিই পৃথিবীর শেষপ্রান্তে কিংবা ভবিষ্যৎ নয় এই পথে সবাই বর্তমানটুকুই খোয়ায়। কিন্তু এসবই পরস্পরবিরোধী অনুমান মাত্র, নিশ্চিত করে কিছুই জানা যায় না। অনগ্রসর, মিডিওকার মগজগুলোতে এ সুড়ঙ্গ নিয়ে নিয়ত হাইপোথিটিক্যাল গবেষণা চলে শুধু। তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল কংক্রিট কোনো সিদ্ধান্তে আসতে না পেরে নগর প্রশাসনের ইতিহাস গ্রন্থের দেয়া তথ্যকেই মেনে নেয় আনত মস্তকে, ‘এই পথে চলে গেলে মহানন্দলোক। চিরপ্রশান্তির অঞ্চল।’

 

কিন্তু সেই মহানন্দলোকে সবাই যেন পাড়ি না জমায় সে কারণে নগরবাসীদের অর্থে সেই সুড়ঙ্গমুখে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কালো পোশাকধারী একটি বাহিনী এ সুড়ঙ্গের নিরাপত্তায় নিয়োজিত। তাদের হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র। সুড়ঙ্গমুখের অল্প দূরেই সুউচ্চ টাওয়ার বসানো। যেখান থেকে অর্ধেক নগরই পর্যবেক্ষণ করা যায়। আরো আছে প্রশিক্ষিত শিকারি কুকুর। কুকুরগুলো সারাক্ষণই বসে বসে লোল ঝরায়, আর যেনবা যোগ্য শিকারের আশায় ওত পেতে থাকে। প্রতিদিন এ সুরঙ্গ দেখার জন্য অসংখ্য মানুষ ভিড় জমায়। কিন্তু দূর থেকে বিশাল ফটক ছাড়া আর কিছুই দর্শনার্থীরা দেখতে পায় না। তবু ভিড় কমে না।

 

বর্ণিত এ নগরেই এক কবির বাস। সোজা হাঁটার দায়ে কবিকে বেশ কয়েকবার হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল, চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্য। চিকিৎসা শেষে বেরিয়ে এসে কবি ফের সোজা হাঁটেন আবার হাসপাতালে যান। শেষবার বেরিয়ে কবি আর সোজা হাঁটার সুযোগ পাননি। কেননা তার দু’পা কেটে নেয়া হয়েছিল। বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কবির কাজ কবিতা লেখা। বেশি ঘোরাফেরা করলে তার কবিতা লেখায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। তাই তাকে গৃহে রাখার স্থায়ী বন্দোবস্ত করা হয়েছে। তাকে দু’পায়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে।

 

এই বিবৃতি প্রকাশ হওয়ার পর ওখানকার পত্রিকাগুলোতে মন্তব্য প্রতিবেদন ছাপানোর হিড়িক লেগে যায়। সব পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় মাননীয় সম্পাদকগণ লিখতে থাকেন অসামান্য সব প্রতিবেদন। তারা হাসপাতালের এ কর্মকে ‘যুগান্তকারী দাওয়াই’ হিসেবে শনাক্ত করেন। তাতে করে নগরবাসীর কাছে পুনরায়, সাধারণ নাগরিকের প্রতি কল্যাণকামী নগরের আদর্শ রূপটিই উদ্ভাসিত হয়। আর তাই এ অসামান্য নগরের বাসিন্দারূপে প্রেরিত হওয়ায়, নাগরিকেরা ঈশ্বরের উদ্দেশে নিবেদন করে কৃতজ্ঞমন্ত্র।

 

এদিকে, পায়ের বন্ধন হতে মুক্ত কবি প্রকৃত অর্থেই গৃহবাসী হন। তার যাপন নির্ধারিত হয়ে যায় গন্ডিবদ্ধ আয়তনের সীমায়। সেই স্বল্পায়তনের ঘেরাটোপে থেকে কবি কিছু উদ্ভট কথাবার্তা লেখেন। সেই কথাগুলো এ রকম-

 

অন্ধকার, সময় এবং ব্রহ্মাণ্ডের বিস্মৃতি সমান, এক এবং অভেদ। পরমাণুর ফিউশন প্রক্রিয়া শেষ হলে সূর্য নিভে যাবে। কোনো একদিন সব নক্ষত্র একে একে হারাবে তার জ্যোতি। তখন! শুধুই হু হু করা অন্ধকার। আমাদের এই মায়াময় পৃথিবীর সব অংশে একই সময় আলো পৌঁছোয় না। এত পরাক্রমশালী সূর্যের সেই সামর্থ্য নেই যে একই সঙ্গে আলোকিত করবে এই ছোট্ট চরাচর। তাকেও নিয়মমাফিক অখ- সময়ের দাসত্ব মেনে আলো দিতে হয় এক অংশের পর অন্যকোনো অংশে। কিংবা অন্য কথায় বলা যেতে পারে- এই অন্তহীন ব্রহ্মাণ্ডের সমস্তকিছুই আলোকিত হয় না কখনো। যতটুকু আলোর সংস্পর্শে আসে তারচেয়ে’ অনেক বেশি অংশ অনালোকিত। সেই অনেক বেশি অংশ এত বিস্তৃত যে, মানবীয় বিবেচনায় তা ধারণ করা সম্ভব নয়। এই অসম্ভব আজ কিংবা ভবিষ্যতের জন্যও সমান সত্য।

 

অথচ আমরা নিত্য পূজা দিয়ে যাই আলোর উৎসমুখে। ঘৃণা করি অন্ধকার। কিন্তু অন্ধকার শক্তিমান চিরকাল। অন্ধকারে ভয় জাগে, জাগে শঙ্কা, সম্ভ্রম আর থেকে যায় অপার রহস্য। একদিন খেয়ালে কি বেখেয়ালে মাতৃগর্ভ অন্ধকারে প্রকৃত জন্ম আমার। ক্ষণকাল পর এসে দেখি আলোর পৃথিবী। বেড়ে উঠি আলো-অন্ধকারে। বরাদ্দ কিংবা যাপিত সময় অন্তে পাড়ি দেই অনন্তলোকে। এই মিরাকল শুধুমাত্র একবারের তরেই সম্ভব আর কখনো কোনো কালেই দেখা যাবে না পুনরাবৃত্তির চমক। অনন্তলোক সেও অন্ধকারময় অনুভূতিহীন অচৈতন্যে বিলীন হওয়ামাত্র। তার কোনো অগ্র-পশ্চাৎ নাই। কোনো কালে ছিল না, কোনোকালে থাকবে না। অন্ধকার তবে কী? ইন্দ্রিয় আর মনন দিয়ে তার এক ভাসা ভাসা রূপ আমার জানা। আলোর মহল আমার দেখা। আলোহীনতায় টের পাই অন্ধকার, আলোর জগতে চোখ বুজে গেলে টের পাই দৈর্ঘ্য-প্রস্থহীন অন্ধকার। তবে কি অনন্তযাত্রা আর অন্ধকারের অনুভূতি সমার্থক? না তা নয়। চোখ বুজলে আমার সক্রিয় ইন্দ্রিয় অন্ধকারের ঘ্রাণ নিতে পারে। জানি না অনন্তযাত্রা চিরপ্রশান্তির অভিজ্ঞতাবাহী কিনা। যদি তাই হবে তবে বেঁচে থাকাতেই এত আনন্দ খুঁজে পাই কেন? নাকি যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়নি এখনও তার স্বাদ বুঝতে অপারগ এই মন! সব রহস্য শেষ হলে আদিতে যেমন সমান ছিল অন্ধকার, সময় এবং ব্রহ্মান্ডের বিস্মৃতি, ঠিক সেই একই সমান্তরালে এসে এই তিনমিলে অভেদ হবে পুনর্বার।

 

কবির এসব কথাবার্তা গ্রন্থাকারে প্রকাশ হওয়ার পর, চারদিকে গুঞ্জন শুরু হয়। কেউ বলে বসেন, পাগলের প্রলাপ, কেউ বলে, ভীষণ সময়োপযোগী লেখা, কেউ বলে কিছুই হয়নি আবার কেউবা এর সঙ্গে অবিশ্বাস আর বিদ্রোহের গন্ধ খুঁজে পায়। কিন্তু এতসব আলাপচারিতার ফলে কবির এ গ্রন্থটির বিক্রি হু হু করে বাড়তে থাকে। এরই মাঝে একদিন শোনা যায়, এ গ্রন্থের প্রকাশককে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু গ্রন্থের ডামাডোলের আড়ালে প্রকাশকের নিখোঁজ হবার খবরটি তেমন করে কারো নজর কাড়ে না। শুধু কবি কিছুটা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। অজানা কিছুর আশঙ্কায় কবি নিয়ত প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

 

কবির এই গ্রন্থটি এ নগরের বিক্রির সর্বকালের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এ গ্রন্থ একবার পাঠ করার পর দ্বিতীয়বার কেউই তাদের গৃহ কিংবা কর্মস্থলের শেলফে খুঁজে পায়নি।

 

এ গ্রন্থের জন্য নগর প্রশাসন থেকে কবিকে সর্বোচ্চ নাগরিক পুরস্কার ‘নগর উন্নয়ন পদক’র জন্য মনোনীত করা হলো। মনোনয়নদানের কারণ হিসেবে জানানো হলো, কবির এই অসামান্য গ্রন্থ এ নগর সাহিত্যের ইতিহাসে একটি উল্লেখ্যযোগ্য সংযোজন। এ গ্রন্থ রেকর্ডসংখ্যক বিক্রি হওয়ায় নগর প্রশাসন প্রভূত কর অর্জন করেছে, যা নগরের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। আর তাই একজন কবি হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ‘নগর উন্নয়ন পদক’-এ ভূষিত করা হবে।

 

কবিকে পুরস্কৃত করার আগের দিন রাতে সুড়ঙ্গমুখের অদূরে একটি কালো কফিন আনা হয়। কফিনটি কবরস্থ করার পরিবর্তে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। পোড়ানোর কাজে কোনো কাঠ ব্যবহার করা হয়নি। কাগজ দিয়েই পোড়ানো হলো সেই কফিন। এত রাশি রাশি কাগজ কেন পোড়ানোর কাজে ব্যয় হলো নগরবাসীদের যারা কৌতূহলবশত ঐ দৃশ্য অবলোকন করল তারা ঠিক ঠাহর করতে পারল না। শুধু বাতাসে পোড়া মাংসের গন্ধ ছড়ানোতে নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত শিকারি কুকুরগুলো একটু উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিল। তারা তাদের চিৎকারের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল।

 

পরদিন কবির পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হলো সেই সুড়ঙ্গমুখের কাছে। একটি মঞ্চ করা হলো। প্রতিবারই যেখানে মঞ্চ করা হয়। চারপাশজুড়ে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কালো পোশাকধারীরা শিকারি কুকুরগুলোকে নিয়ে ভাবলেশহীন টহল দিচ্ছে। প্রতিবার এইদিন ‘নগর উন্নয়ন পদক’-এ ভূষিত ব্যক্তিটি থাকেন উচ্ছ্বসিত। কেননা তিনি তখন মহানন্দলোকে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকেন। আর এযাবৎকালে প্রত্যেকেই নগর প্রশাসনের স্তুতি গাইতে গাইতে প্রবেশ করেছেন সুড়ঙ্গে। এরপর আর কখনোই সেই ব্যক্তিকে দেখা যায় না কোথাও। অবশ্য তার প্রয়োজনও হয় না। মহানন্দলোক থেকে কেউ কি আর ধুলো-মাটির পৃথিবীতে ফেরে!

 

এবার প্রথমবারের মতো কোনো কবি এ পদক পাওয়ায় নাগরিকদের সমাগম একটু বেশিই। ব্যতিক্রমের প্রতিই মানুষের আকর্ষণ অধিকমাত্রায় থাকে কি না।

 

আপাদমস্তক সাদা পোশাকে আবৃত নগর প্রশাসকসহ আরো কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি মঞ্চে এলেন। কবি তখনো আসেননি। একে একে মাননীয়গণ তাদের বক্তব্য শেষ করলেন। প্রত্যেকেই নগরের সার্বিক কর্মকা-ে সন্তোষ প্রকাশ করলেন। সেইসাথে যেসব মাননীয়গন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত সেসব প্রতিষ্ঠানে আর্থিক এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য নগর প্রশাসকের কাছে আবেদন জানালেন।

 

অবশেষে পুরস্কৃত কবিকে তার বক্তব্য দেয়ার জন্য দোলনায় করে নিয়ে আসা হচ্ছে। কালো পোশাক পরিহিত দীর্ঘদেহী দুই পালোয়ান রক্তজবা দিয়ে সাজানো কবির দোলনাটি বহন করে নিয়ে আসে। বেতের তৈরি সেই দোলনায় কবি তাঁর দুই ঊরু বের করে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে আছেন। সবাই দেখতে পেল হাঁটুর নিচ থেকে কর্তিত দুই ঊরুতে দুটি মালা পরানো। মঞ্চে এসেই কবি গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, ‘দোলনা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করো। প্রকৃত সত্যকে জানো।’ চারপাশে ফিসফিস আওয়াজ শোনা যায়। হঠাৎ এমন অপ্রাসঙ্গিক কথা কেন? কবির মুখে হাসি নেই কেন? তবে কি এ পুরস্কার কবিকে সুখী করেনি? কবি বলতে থাকেন-

 

‘এ সুড়ঙ্গ পৃথিবীর শেষপ্রান্তে নয়, এ নগরীই পৃথিবীর শেষপ্রান্তে। সভ্যতার ক্ষয়িষ্ণু চর্চায় ধ্বংসের শেষ সীমায় এসে ঠেকেছে এ নগর। সুড়ঙ্গ কোনো মহানন্দলোকে নয়, অনন্ত অন্ধকারে পৌঁছে গেছে। এখানে প্রবেশ করলে সবাই বর্তমানটুকু খোয়ায়। অর্থাৎ মৃত্যু। অবশ্য মৃত্যুই প্রত্যেকের ভবিষ্যৎ গন্তব্য হলে, যারা ভাবেন এই সুড়ঙ্গ ভবিষ্যতে চলে গেছে তারা আসলে এক অর্থে সঠিক কথাই বলেন।’

 

সবার মধ্যে কলরোল শুরু হয়। কিসব আবোল-তাবোল কথা বলছে কবি! তবে কি লোকটি শেষপর্যন্ত পাগল হয়ে গেল। সবাই কবির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। আহা, শেষ পর্যন্ত কবির মাথাটাই বিগড়ে গেল, তাই এ বিশাল পুরস্কারের মর্ম বুঝতে পারল না। এমন ধরনের চিন্তায় যখন সবাই ব্যস্ত তখন কবি আবারও বলতে শুরু করেন-

 

‘কবিকে মেরে ফেলা হলে বুঝতে হবে সে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’

 

কবিকে আর কোনোকিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কবি উপহাস ভরা ভঙ্গিতে রক্তজবা দিয়ে সাজানো তার দোলনা থেকে একটি রক্তজবা খসিয়ে ছুড়ে দিলেন নগর প্রশাসকের দিকে। নগর প্রশাসকের মুখবেয়ে ফুলটি ডানহাতে স্থান করে নেয়। সদাস্মিতহাস্যমুখ নগর প্রশাসক হাত উঁচিয়ে ফুলটি সবাইকে দেখালেন। সমবেত সকলে হৈ হৈ করে উঠল। যেন এমন বিরল দৃশ্য কেউ কখনো দেখেনি আগে। শুধু নগর প্রশাসকের চোয়াল আচানক শক্ত হয়ে উঠল।

 

যেতে যেতে কবি বলার চেষ্টা করেন-

 

‘আমার এই অন্তর্ধান থেকে অজস্র প্রতিবাদী কণ্ঠের জন্ম হোক।’

 

কবির মুখ চেপে ধরা হলো। তাঁকে সুড়ঙ্গমুখের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। বিশালদেহী কালোপোশাকধারী দুই পালোয়ান একটি চাকাওয়ালা চেয়ারে কবিকে বসিয়ে চারহাতে সর্বশক্তিতে সুড়ঙ্গমুখে ঠেলে দিল। সুড়ঙ্গে ধাবিত হতে হতে অট্টহাসিতে সবকিছু ভাসিয়ে দিয়ে চিৎকার করে কবি বলতে থাকেন-

 

‘চিরকাল এমনই হয়, বলেছিলাম তো নাকি, অন্ধকারই প্রবল, আলো রুগ্ণ আর দুর্বল। আমি অন্ধকারে হারাব এটাই তো সত্যি। সবকিছুই একদিন অন্ধকারে মিলাবে।’

 

উপস্থিত নাগরিকদের কানে দূরবর্তী কবির এসব কথা পৌঁছেনি। তবে কবির অট্টহাসি তারা শুনতে পেয়েছিল। তারা পুনর্বার দেখে গেল ‘নগর উন্নয়ন পদক’-এ ভূষিত কবি হাসতে হাসতেই সুড়ঙ্গমুখে প্রবেশ করেছেন, প্রত্যেকেই যেভাবে যান।

 

কবির শেষ দৃশ্যটি এমন আকস্মিকতায় পূর্ণ ছিল যে, সমাপনী বক্তব্য দিতে আসা নগর প্রশাসক সমবেত নাগরিকের কাছে তেমন কোনো পাত্তাই পেলেন না। তারা হট্টগোল করতে করতে যে যার মতো করে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতে লাগল। আর এই দৃশ্য দেখে নগর প্রশাসক তার হাতে থাকা রক্তজবাকে অজান্তেই এমনভাবে পিষ্ট করলেন, তার ডান হাতের পুরো তালুটাই রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি ক্ষোভে ফুঁসতে থাকেন। তার ঘাম ছুটে যায়। অবশ্য বাইরে থেকে তার সদা স্মিতহাস্যমুখ দেখে এ বিষয়টি ঠাহর করার কোনো উপায় নেই। শুধু ঘাম মুছতে গিয়ে বেখেয়ালে ডান হাতের চেটো ব্যবহারের পর উল্টো হাঁটায় অভ্যস্ত সবাই দেখতে পেল, সাদা পোশাক পরিহিত রক্তাক্তমুখে দাঁড়িয়ে আছে তাদের নগর প্রশাসক।

 

অন্তিম ভটিমা

 

ফেরার দরজা যদি থেকে যায় খোলা

 

পথ চলাতেই আহা সুখ অপার;

 

যখন জানি তরী ফিরবে না ঘাটে

 

ঝুপ করে নামে তবে বেদনার ভার।

 

 

 

 

আমাদের সকাল/সোহেল রানা

Share Button
সম্পাদক: রিনি জাহান
নির্বাহী সম্পাদক : মো. কাইছার নবী কল্লোল
যোগাযোগ : ১/এ, (২য় তলা), পুরানা পল্টন লেন, ঢাকা-১০০০
ফোন নম্বর : ০১৬২১০৩৫২৮৯, ০১৬৩৪৭৩১৩৪২
Email: amadarshokal24@gmail.com